২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১৮ ডিসেম্বর। সবগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি নিজেদের সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী খেলোয়াড় কিনে দল সাজিয়েছে। কোনো কোনো খেলোয়াড় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দাম পেয়েছেন, আবার অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার বেশ কম মূল্যে বিক্রি হয়েছেন।

আবার কোনো কোনো দল একই পজিশনের জন্য একাধিক খেলোয়াড় কিনলেও অন্যান্য পজিশনে তাদের ভালো মানের খেলোয়াড় নেই বললেই চলে। এমন আরো অনেক কিছু ঘটেছে এবারের আইপিএলের নিলামে। চলুন, এক নজরে সে বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া যাক।

স্যাম কুরানের চড়া মূল্য

এবারের আইপিএলের নিলামে ইংল্যান্ডের তরুণ ক্রিকেটার স্যাম কুরানকে ১ মিলিয়ন ডলার দাম দিয়ে দলে ভিড়িয়েছে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। তিনি বেশ প্রতিভাবান ক্রিকেটার, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি কি মিলিয়ন ডলার দাম পাওয়ার যোগ্য?

স্যাম কুরান; Source: indianexpress.com

সর্বশেষ ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার সিরিজে নিকোলাস পুরান ও শিমরন হেটমায়ার বেশ ভালো পারফরম্যান্স করেছেন। সে কারণে তারা নিলামে ভালো দামও পেয়েছেন। কিন্তু স্যাম কুরান কি ভালো খেলেছেন? হ্যাঁ, তিনি ভালো খেলেছেন, তবে সেটা টেস্টে। দেশের মাটিতে তিনি ভারতের বিপক্ষে অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করে ইংল্যান্ডকে টেস্ট ম্যাচ জিতিয়েছেন এবং ম্যান অব দ্য সিরিজ হয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনো ইংলিশদের টি টোয়েন্টি দলে অন্তুর্ভুক্ত হননি। টেস্টে পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করে তাকে এত বেশি মূল্যে কেনা পাঞ্জাবের জন্য খুব বেশি যুক্তিযুক্ত হয়নি।

স্যাম কুরান; Source: thepaper.com

এছাড়া বামহাতি বোলাররা টি টোয়েন্টিতে সব সময়ই তুরুপের তাস। কিন্তু কুরান অনেক ধীরে বল করে থাকেন। ফলে তার বোলিং পাঞ্জাবের জন্য কতটা কার্যকরী হবে, সেটাও দেখার বিষয়। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টি টোয়েন্টি লিগ ন্যাটওয়েস্ট টি টোয়েন্টি ব্লাস্টেও তিনি আহামরি পারফরম্যান্স করেননি। তাই বয়স ও উদ্যম কুরানের পক্ষে গেলেও তার জন্য এক মিলিয়ন ডলার বা ৭.২ কোটি রুপি অনেক চড়ামূল্য।

পাঞ্জাবের মিডল অর্ডারে ব্যাটসম্যানের অভাব

এবারের নিলামে খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রে অনেক অর্থ ব্যয় করেছে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। প্রতিটি দলের জন্য ৩৫ কোটি রুপি পর্যন্ত অর্থ ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা ছিল। তারা প্রায় ৩২ কোটি রুপি খরচ করেছে। তবে এরপরও তাদের স্কোয়াডে,বিশেষ করে মিডলঅর্ডারে ব্যাটসম্যানের বেশ অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব; Source: therahnuma.com

ডেভিড মিলারের উপর ভরসা করা যায় না। কারণ তিনি পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক নন। অন্যদিকে করুন নায়ার ও মায়াঙ্ক আগারওয়াল গত মৌসুমে নিজেদের স্বাভাবিক ব্যাটিংও করতে পারেননি। ওপেনার লোকেশ রাহুল গত মৌসুমে ভালো করলেও তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খুব বেশি ভালো নয়। ফলে তাদের উচিত ছিল, নিলাম থেকে দুই একজন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান কেনা। কিন্তু তারা সেটা করেননি।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পাওয়ার প্লে ও ডেথ ওভারে কার্যকর আফগান স্পিনার মুজিব উর রহমান দলে থাকা সত্ত্বেও আরেক স্পিনার বরুণ চক্রবর্তীকে কিনেছে পাঞ্জাব। এছাড়া তাদের অধিনায়ক রবিচন্দ্রন অশ্বিন তো আগে থেকেই রয়েছেন। এরপরও ব্যাটসম্যান না কিনে বোলার কেনা মোটেই  যুক্তিসঙ্গত হয়নি।

টেস্ট বিশেষজ্ঞ হনুমা বিহারি ও ইশান্ত শর্মার পেছনে ৩.১ কোটি রুপি ব্যয়

আগের দিল্লি ডেয়ারডেভিল এবার নতুন মালিকানায় নতুন নামে দিল্লি ক্যাপিটালস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভারতের রাজধানীর নামে করা ফ্র্যাঞ্চাইজিটি এখন পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি। তবে এবার বেশ কোমর বেঁধে নেমেছে দিল্লির নতুন মালিকপক্ষ।

ইশান্ত শর্মা; Source: moneycontrol.com

দিল্লি নিলাম থেকে হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান কলিন ইনগ্রাম, অলরাউন্ডার অক্ষর প্যাটেল এবং দুই ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার শেরফেন রাদারফোর্ড ও কিমো পলকে কিনেছে। এছাড়া তারা দুই টেস্ট স্পেশালিস্ট হনুমা বিহারি ও ইশান্ত শর্মাকেও ৩.১ কোটি রুপি দাম দিয়ে কিনেছে।

দিল্লির অন্যতম মালিক পার্থ জিন্দাল ইশান্ত শর্মাকে ১.১ কোটি রুপিতে কেনার পেছনে যুক্তি দেখান যে, দিল্লির ঘরের মাঠ ফিরোজ শাহ কোটলা এই ভারতীয় পেসারের বেশ চেনা একটি মাঠ। এই মাঠে তার ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইশান্ত টেস্টে ভালো মানের বোলার হলেও টি টোয়েন্টির জন্য তিনি উপযুক্ত নন। গত মৌসুমে তিনি নিলামে অবিক্রিতই ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাব তাকে রিপ্লেসমেন্ট খেলোয়াড় হিসেবে দলে নিয়েছিল। তবে সেবার একটি ম্যাচেও মাঠে নামা হয়নি তার।

হনুমা বিহারি; Source: sportskeeda.com

অন্যদিকে হনুমা বিহারিকে ২ কোটি রুপিতে দলে ভিড়িয়েছে দিল্লি। ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি অনেক ভালো এবং তার ব্যাটিং কৌশলও বেশ নজরকাড়া। তবে তিনি আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে পারেন না। টি টোয়েন্টিতে তার ব্যাটিং গড় মাত্র ১১১.১২। এছাড়া দিল্লিতে শিখর ধাওয়ান, পৃথ্বী শ, শ্রেয়াস আয়ার ও ঋষভ পন্ত থাকায় হনুমা কোথায় ব্যাট করবেন, সেটাও বড় এক প্রশ্ন।

অবিক্রিত ডেল স্টেইন

আইপিএলের এবারের নিলামে দামি ক্রিকেটারদের মধ্যে রয়েছেন বেশ কয়েকজন ফাস্ট বোলার। নিলামের আগেই ধারণা করা হয়েছিল যে, এবার পেসাররা বেশ ভালো দাম পাবেন এবং প্রায় প্রতিটি দলই পেসারদের দিকে বাড়তি নজর দেবে। তাদের সেই ধারণা সত্যি হলেও বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা পেসার ডেল স্টেইন অবিক্রিত থেকে গেছেন। তার নাম তিনবার আসলেও কোনো দলই বিড করেনি।

ডেল স্টেইন; Source: aurthosuchak.com

স্টেইনের বলে দুর্দান্ত গতি ও মারাত্মক সুইং থাকলেও গত কয়েক বছর ধরেই তিনি চোটের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তাকে না কেনার পেছনে এটি বড় একটি কারণ। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়রা ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত খেলতে পারবেন। সে কারণেও হয়তো তার জন্য অর্থ খরচ করতে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেননি।

ফর্মে থেকেও দল পাননি মনোজ তিওয়ারি

ভারতের বাঙালি ব্যাটসম্যান মনোজ তিওয়ারির ভিত্তিমূল্য ৫০ লাখ রুপি থাকা সত্ত্বেও কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি তাকে কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। ২০১৭ সালে রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টের হয়ে ১৩ ইনিংসে ৩২.৪০ গড়ে ৩২৪ রান করেছিলেন তিনি।

মনোজ তিওয়ারি; Source: crictracker.com

তবে গত মৌসুমে মনোজ পাঞ্জাবের হয়ে খেলেন। কিন্তু প্রথম ছয়টি ম্যাচে তাকে মাঠেই নামায়নি। এছাড়া তাকে টানা দুই ম্যাচে খেলার সুযোগ দেয়া হয়নি। গতবার তিনি মোট পাঁচ ম্যাচ খেলেছিলেন, তার মধ্যে চার বার ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছিলেন।এর মধ্যে তিনি দুইবার ছয় নম্বরে ও একবার সাত নম্বরে ব্যাট করেন। চার ইনিংসের মধ্যে তিনি এক ইনিংসে ৩০ বলে ৩৫ রান ও আরেক ইনিংসে ৪৭ রান করেন।

তবে চলতি বছর তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে ৫০ ওভারের ম্যাচে ভালো খেলেছেন। প্রায় ৪৪ গড়ে তিনি মোট ৪৩৮ রান করেছেন। তার স্ট্রাইক রেট ছিল ৭৯.৬৩। এরপরও তিনি নিলামে অবিক্রিত থেকে গেছেন।

সুযোগ মেলেনি ভারতের তরুণ পেসারদের

এবার দিয়ে দ্বাদশ বারের মতো আইপিএলের নিলাম অনুষ্ঠিত হলো। কিন্তু বরাবরের মতো এবারো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ভারতের তরুণ পেসারদের কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তারা চড়া মূল্যে মোহিত শর্মা (৫ কোটি রুপি), বরুণ অ্যারন (২.৪ কোটি রুপি) ও বারিন্দ্রার শ্রান (৩.৪ কোটি রুপি) কিনলেও কম মূল্যে তরুণদের কেনার কথা একবারও ভাবেননি।

ভারতের তরুণ পেসাররা এবারো ব্রাত্য; Source: scroll.in

 আপনি যদি বিগ ব্যাশ, সিপিএল, পিএসএল ও বিপিএলের দিকে দেখেন, সেখানে প্রায় প্রতিটি দলেই স্থানীয় তরুণ পেসাররা খেলে থাকেন। ভারতে টিএনপিএল বা কেপিএলে তরুণ পেসাররা সুযোগ পান। তবে এই টুর্নামেন্টগুলো মানের দিক থেকে আইপিএলের অনেক পেছনে পড়ে আছে। ভারতীয় দলে এখনো ভালো মানের পেসারের অভাব রয়েছে। সেখানে আইপিএলর যদি তরুণ পেসাররা তেমন সুযোগ না পান, তাহলে জাতীয় দল যোগ্য পেসার পাবে কীভাবে?