বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ একটি সমীহ জাগানিয়া নাম । প্রায় দেড় যুগ আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু হলেও বিগত পাঁচ থেকে ছয় বছরে সবচেয়ে বেশি সফলতার মুখ দেখেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ দল। আর এটিই ছিল তাদের সর্বপ্রথম কোনো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠা। এ বছরও এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো শিরোপা জিততে পারেনি টাইগাররা।

২০১৫ থেকে ২০১৮ এই তিন বছরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে টাইগার বাহিনী। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনাল খেলার গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ দল। এরপর একই বছর ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নেয় টাইগাররা। এছাড়া ২০১৭ সালে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রফির সেমিফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। চলতি বছরেও বাংলাদেশ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি টেস্ট, দুটি ওয়ানডে ও একটি টি টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে তারা।

Image source: the daily star

বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ যেমন দুর্দান্ত কিছু সাফল্য অর্জন করেছে, তেমনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নিজেদের নাম ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করেছেন অনেক ক্রিকেটার। আজ আমরা আলোচনা করবো, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের গড়া সেরা ৬ টি রেকর্ড সম্পর্কে।

৬. সবচেয়ে কম বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে ৫ উইকেট প্রাপ্তি

চলতি বছরের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল দুই ম্যাচের টেস্ট, তিন ম্যাচের ওয়ানডে ও তিন ম্যাচের টি টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে বাংলাদেশ সফরে আসে। দুই ম্যাচের টেস্ট  সিরিজের প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় চট্রগ্রাম জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামে। আর এই ম্যাচে অভিষেক হয় তরুণ উদীয়মান অফস্পিনার নাঈম হাসানের। ১৭ বছর  বয়সী নাঈম হাসান উইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে ধস নামিয়ে ৬১ রানের বিনিময়ে লাভ করেন ৫ টি উইকেট। এর মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ বোলার হিসেবে তিনি ৫ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়েন।

Image source: cricketcountry.com

নাঈম হাসান ১৭ বছর ৩৫৬ দিন বয়সে এই কীর্তি গড়লেন। এর আগে টেস্টে ৫ উইকেট নেওয়া সর্বকনিষ্ঠ বোলার ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্যাট কামিন্স। তিনি ১৮ বছর ১৯৬ দিন বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে ৭৯ রানের বিনিময়ে ৬ টি উইকেট লাভ করেছিলেন।

৫. অভিষেক টেস্ট ও ওয়ানডেতে ম্যাচ সেরা

মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ২০১৫ সালে ভারতের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে অভিষেক হয় তার। অভিষেক ম্যাচে তিনি ৫ টি উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এরপর সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচেও মোস্তাফিজ ৬ টি উইকেট তুলে নিয়ে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জেতাতে অনবদ্য ভূমিকা রাখেন।

Image source: cricketcountry.com

ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেকের চার মাস পর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে অভিষেক হয় মোস্তাফিজের। সেই টেস্টের প্রথম ইনিংসে তিনি চারটি উইকেট লাভ করেন। তবে বৃষ্টির কারনে ম্যাচটি ড্র হয়। অভিষেক টেস্টেও  তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন। ফলে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে দুই সংস্করণের অভিষেক ম্যাচেই ম্যাচ সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন মোস্তাফিজ।

৪. সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান

২০০১ সালে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে অভিষেক হয় মোহাম্মদ আশরাফুলের। সেই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি দীর্ঘ চার ঘন্টা ক্রিজে থেকে ২১২ বল মোকাবেলা করে ১১৪ রান সংগ্রহ করেন। তার ইনিংসটি ছিল ১৬ টি চারে সাজানো।

Image source: cricketcountry.com

তবে আশরাফুলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পরও সেই ম্যাচে বাংলাদেশের পরাজিত হয়। ম্যাচের তৃতীয় দিনেই ইনিংস ব্যবধানে হেরে যায় টাইগাররা। কিন্তু সেই ম্যাচে বাংলাদেশ হারলেও ১৭ বছর ৬৩ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন মোহাম্মদ আশরাফুল। এর আগে ১৯৬১ সালে ১৭ বছর ৮২ দিন বয়সে টেস্ট সেঞ্চুরি করেছিলেন পাকিস্তানের মোস্তাক মোহাম্মদ। এরপর ১৯৯০ সালে ১৭ বছর ১১২ দিন বয়সে টেস্ট সেঞ্চুরি করেন শচীন টেন্ডুলকার।  

৩. এক ভেন্যুতে সর্বোচ্চ রান ও সর্বোচ্চ উইকেট

এক সময় ঘরের মাঠে বাংলাদেশের অধিকাংশ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। কিন্তু এখন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের পরিবর্তে বাংলাদেশের হোম অব ক্রিকেট বনে গেছে মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামে ওয়ানডে খেলে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৮১ রান সংগ্রহ করেছেন তামিম ইকবাল। এটিই এখন পর্যন্ত ওয়ানডে ক্রিকেটে কোন ব্যাটসম্যানের এক ভেন্যুতে সংগৃহীত সর্বোচ্চ রান।

Image source: cricketcountry.com

৩৯৯৫ রান সংগ্রহ করে এই তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন সাকিব আল হাসান। এছাড়া মিরপুরে ১১৯ টি উইকেটও সংগ্রহ করেছেন সাকিব আল হাসান। এটিও কোনো বোলারের এক ভেন্যুতে সর্বোচ্চ উইকেট শিকার।

২. আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ হাজার রান এবং ৫০০ টি উইকেট

সাকিব আল হাসান বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ। টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি টোয়েন্টি সকল ফরম্যাটেই একজন মানানসই ক্রিকেটার তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যে তিনজন অলরাউন্ডার ১০ হাজার রানের পাশাপাশি ৫০০ টি উইকেট সংগ্রহ করেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে এই কীর্তি গড়েছেন সাকিব।

Image source: cricketcountry.com

সাকিব আল হাসান ৩০২ টি ম্যাচ খেলেই এই কীর্তি গড়েন। যেখানে জ্যাক ক্যালিস খেলেছিলেন ৪২০ টি  ম্যাচ এবং শহীদ আফ্রিদি খেলেছিলেন ৪৭৭ টি ম্যাচ। এছাড়া  ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫ হাজার রানের পাশাপাশি ২০০ টি উইকেট নেওয়া ক্রিকেটারদের তালিকাতেও প্রথম অবস্থানে রয়েছেন তিনি।

১. প্রথম উইকেটকিপার হিসেবে টেস্টে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি

মুশফিকুর রহিম প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ২০১৩ সালে গল টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করেন। এরপর ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে ২০৬ রান করেন তামিম ইকবাল। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে ২১৭ রানের একটি ইনিংস খেলেন সাকিব আল হাসান।

Image source: cricketcountry.com

কিন্তু ২২ মাস পর গত নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে অপরাজিত ২১৯ রানের ইনিংস খেলে সাকিবের রেকর্ড ভাঙ্গেন মুশফিক। আর এই সেঞ্চুরির মধ্য দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন মুশি। টেস্ট ইতিহাসের সপ্তম ক্রিকেটার হিসেবে  দুটি ডাবল সেঞ্চুরির মালিক হলেন তিনি।

Featured image source: cricketcountry.com