বর্তমান সময়ে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অন্যতম সেরা একটি খেলা ক্রিকেট। মূলত ব্যাটে-বলের লড়াইয়ে এই খেলাটি হয়ে উঠেছে বেশ উপভোগ্য ও জনপ্রিয়। তবে এ খেলাতেও কখনো কখনো এমন কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায়, যা বিশ্ব ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয় ব্যথিত করে তোলে।

মনে পড়ে অস্ট্রেলিয়ান সেই তরুণ ক্রিকেটার ফিল হিউজের কথা? যার মৃত্যুতে থমকে গিয়েছিল বিশ্ব ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ের স্পন্দন। ক্রিকেট ইতিহাসে এরকম আরো অনেক ঘটনাই ঘটেছে, কেউ মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছেন, কেউ গুরুতর আহত হওয়ার কারণে আর ক্রিকেট মাঠে বল- ব্যাট হাতে ফিরতেই পারেননি, কেউবা অনেক সংগ্রাম করে মাঠে ফিরেছেন। আজকের প্রতিবেদনে তেমনি সাত ক্রিকেটার নিয়ে আলোচনা করবো।

৬. স্টিভ ওয়াহ ও জেসন গিলেস্পি (অস্ট্রেলিয়া)

কী ভাবছেন? দুজন প্লেয়ার একই সাথে আবার ইঞ্জুরড হয় কীভাবে? ১৯৯৯ সালে গল টেস্টে শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান মাহেলা জয়াবার্ধনের একটি শটে বল হাওয়ায় ভাসতে থাকে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ান দুই ফিল্ডার স্টিভ ওয়াহ ও জেসন গিলেস্পি সেই বলটি তালুবন্দি করতে খুব দ্রুত গতিতে দৌড় দেয়। দুজন ফিল্ডারই বলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দৌড়ানোর ফলে একটা সময় দুজন দুজনার সাথে বেশ জোরালোভাবে ধাক্কা খায়।

স্টিভ ওয়াহ ও জেসন গিলেস্পি; Source: cricketaddictor.com

স্টিভ ওয়াহ ও জেসন গিলেস্পির পরষ্পরের ধাক্কা খাওয়ার গতি এতটাই ছিল যে, তাদের দুজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল এবং বেশ কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে হয়েছিল। ঘটনার সময় স্টিভ ওয়াহ নাক ভেঙেছিলেন এবং জেসন গিলেস্পি পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন।

৫. আব্দুল আজিজ (পাকিস্তান)

আব্দুল আজিজ ছিলেন পাকিস্তানি তরুণ ক্রিকেটার। তিনি পাকিস্তানের করাচি ক্লাবের হয়ে ফার্স্ট-ক্লাস ম্যাচ খেলতেন। আব্দুল আজিজ ছিলেন উইকেটরক্ষক ও ব্যাটসম্যান। ১৯৫৯ সালে করাচির হয়ে একটি ম্যাচে দিলোয়ার অ্যাওয়ান নামক একজন স্পিন বোলারের বল সরাসরি আজিজের বুকে গিয়ে আঘাত হানে। তাৎক্ষণিক তার কিছু না হলেও যখন অ্যাওয়ানের পরের বল মোকাবিলা করার জন্য আব্দুল আজিজ প্রস্তুতি নেন, তখনি তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং মাঠেই মৃত্যুবরণ করেন।

আব্দুল আজিজ; Source: cricketaddictor.com

ক্রিকেট ইতিহাসে খেলা চলাকালীন মাঠেই মৃত্যুবরণ করার প্রথম ঘটনা ছিল এটি। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই আব্দুল আজিজের এই অকাল মৃত্যু ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি করাচি দলের হয়ে মাত্র ৮টি ম্যাচে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলেন।

৪. মার্ক ভার্মুলেন (জিম্বাবুয়ে)

একবার নয়, দুইবার নয়, জিম্বাবুয়ান এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তিনবার মারাত্মকভাবে মাথায় আঘাত পান। এমনকি দুইবার তার মাথার খুলিতে ফাটলও ধরে গিয়েছিল। ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে ভারতের ফাস্ট বোলার ইরফান পাঠানের ডেলিভারি করা বল তার মাথায় আঘাত হেনেছিল। যাতে তিনি বেশ গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন।

মার্ক ভার্মুলেন; Source: NewsBytes

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিতর্কিত ঘটনার সাথে জড়িত থাকা এই ক্রিকেটার হতাশা ও উন্মাদনায় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট একাডেমিতে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়েছিলেন। এর দায়ে তাকে জেলেও প্রেরণ করা হয়েছিল। অবশেষে ২০১৫ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্ণবাদী মন্তব্যের দায়ে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট কতৃপক্ষ মার্ক ভার্মুলেনকে সকল স্তরের ক্রিকেট হতে নিষিদ্ধ করে। জিম্বাবুয়ের হয়ে মার্ক ভার্মুলেন মোট ৫২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ করে ১,৩১৭ রান সংগ্রহ করেছিলেন।

৩. রাইলি রুশো (দক্ষিণ আফ্রিকা)

দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম আগ্রাসী ব্যাটসম্যান রাইলি রুশো। জাতীয় দলের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের প্রিমিয়ার লীগগুলোতেও তিনি বেশ পরিচিত একজন ক্রিকেটার। তবে ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার প্রিমিয়ার লীগের একটি ম্যাচে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। বাস্নাহীরা ক্রিকেট ডান্ডির হয়ে ব্যাট করতে নেমে রুহুনা রয়্যালসের বোলার লাসিথ মালিঙ্গার প্রতি ঘণ্টায় ১৪১ কিলোমিটার গতির একটি বল তার হেলমেট ভেদ করে নাকে গিয়ে আঘাত হানে।

রাইলি রুশো; Source: cricketaddictor.com

সাথে সাথে নাক দিয়ে বেশ রক্ত ঝরতে থাকে এবং রাইলি রুশো মাটিতে বসে পড়েন। নাকের মাংসপেশীতে বেশ জখম হওয়ায় নাকে তিনটি সেলাই দিতে হয়েছিল। এরপর বেশকিছু দিন মাঠের বাইরে থাকলেও পরে আবার ব্যাট হাতে মাঠ মাতাতে ফিরে আসেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে রাইলি রুশো এ পর্যন্ত ৫১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১,৫৬৬ রান করেন। তবে ২০১৬ সালের পর জাতীয় দলের হয়ে রাইলি রুশোকে আর খেলতে দেখা যায়নি।

২. ওয়াসিম রাজা (পাকিস্তান)

ঊনবিংশ শতকের সত্তর-আশির দশকে পাকিস্তান দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন ওয়াসিম রাজা। দলের প্রয়োজনে বল হাতেও বেশ সমৃদ্ধ ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট ১১১টি ম্যাচ খেলেন ওয়াসিম রাজা। ব্যাট হাতে ৩,৬০৩ রান এবং বল হাতে ৭২টি উইকেট শিকার করেন তিনি।

ওয়াসিম রাজা; Source: amazon.com

ক্রিকেটে খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার শেষে ওয়াসিম রাজা পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে কোচের দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ১৫টি টেস্ট ও ৩৪টি ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ম্যাচের রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওয়াসিম রাজা। এরপর ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বাকিংহ্যমশায়ারে পঞ্চাশোর্ধ দলের হয়ে একটি ম্যাচ খেলতে নেমে খেলা চলাকালীন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

১. ফিলিপ হিউজ (অস্ট্রেলিয়া)

অস্ট্রেলিয়ার এক উদীয়মান ক্রিকেটার ছিলেন ফিল হিউজ। তিনি সাধারণত অস্ট্রেলিয়া দলের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান ছিলেন। যথারীতি ২০১৪ সালে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন হিউজ। বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে থাকা হিউজ পূর্ণ করেছিলেন হাফসেঞ্চুরিও। এরপর প্রতিপক্ষ দল নিউ সাউথ ওয়েলস দলের ফাস্ট বোলার শন অ্যাবটের একটি বাউন্স বল হিউজের মাথার পিছনে গিয়ে আঘাত হানে। সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন হিউজ।

ফিল হিউজ; Source: cricketaddictor.com

মাঠে থাকা ডাক্তাররা বাউন্ডারির বাইরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থা বেগতিক দেখে সিডনি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় হিউজকে। সেখানে অস্ত্রোপোচার করা হলেও আর জ্ঞান ফেরেনি ফিল হিউজের। তিন দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে পুরো ক্রিকেটবিশ্বকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমান তিনি।

ফিল হিউজ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সর্বমোট ৫২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ২,৩৬৭ রান করেন। তার এই অকাল মৃত্যুর ঘটনাটি পুরো ক্রিকেট বিশ্ব সারাজীবন মনে রাখবে। এ ঘটনার পর বাউন্সার বল করা বোলার শন অ্যাবটকে পুনরায় খেলায় ফিরে আসতে বেশ কয়েকটি কাউন্সেলিং ক্লাস করতে হয়েছিল।

Featured Image Source: Forbes