ভারতীয় ক্রিকেটে নিজেকে কিংবদন্তি তুল্য হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলেও অনেক কিংবদন্তির চেয়ে সমর্থকদের হৃদয়ে যুবরাজ সিংয়ের আসনের পরিধি নেহাৎ কম নয়। ক্যারিয়ারের অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়েও সমর্থকদের কাছে কুন্ঠাহীনভাবে সমর্থন পেয়েছেন যুবরাজ। ক্যান্সারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্রিকেটে ফেরা এই ক্রিকেটার সবসময়ই থাকেন দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। আমাদের আজকের আলোচনা সাজানো হয়েছে যুবরাজ সিংয়ের জানা অজানা কয়েকটি চমকপ্রদ তথ্য নিয়ে।

ক্রিকেটীয় রক্ত

অনেকেই হয়তো জানেন না, যুবরাজ সিংয়ের বাবা যোগরাজ সিং একজন সাবেক ক্রিকেটার। ভারতের হয়ে ৬টি ওয়ানডে এবং ১টি টেস্ট খেলেছেন যোগরাজ। ক্রিকেটার বাবার ঘরে ১৯৮১ সালের ১২ই ডিসেম্বর চন্ডীগড়ে জন্মগ্রহণ করেন যুবরাজ। খুব কম বয়সেই যুবরাজকে তার বাবা, মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদের সম্মুখীন হতে হয়। চন্ডীগড়েরই একটি পাবলিক স্কুলে এই ক্রিকেটারের শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়।

যুবরাজ সিং; Source: Getty Images

অল্প বয়স থেকেই খেলাধুলার প্রতি যুবরাজের আগ্রহ আশপাশের মানুষের নজর এড়ায়নি। পুরো শৈশব জুড়ে রোলার স্কেটিং এবং টেনিসে নিজের আগ্রহ ডুবিয়ে রেখেছিলেন এই ক্রিকেটার। উঠতি বয়সে রোলার স্কেটিংয়ে সফলতাও পেয়েছিলেন যুবরাজ। অনূর্ধ্ব-১৪ দলে খেলার সময়ই ন্যাশনাল রোলার স্কেটিংয়ের চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন যুবরাজ৷ কিন্ত রোলার স্কেটিংয়ে জাতীয় পর্যায়ে মেডেল জেতার পরেও ছেলের পারফরম্যান্সে তৃপ্ত ছিলেন না বাবা যোগরাজ। রোলার স্কেটিং ছেড়ে ছেলেকে ক্রিকেটেই স্থির মনোনিবেশ করতে বাধ্য করেন যোগরাজ।

নভোজিৎ সিংয়ের অনুপ্রেরণা

রোলার স্কেটিংকে বিদায় জানানোর পর শুরুর দিনগুলোতে মোটেও ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতেন না যুবরাজ। যোগরাজ সিংয়ের অনুরোধে যুবরাজকে ট্রেনিং করাতেন সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার নভোজিৎ সিং সিধু। ব্যাটিংয়ে খারাপ পারফরম্যান্স এবং বল করতে গিয়ে যুবরাজের অতিরিক্ত ফুলটস দেয়ার প্রবণতা নিয়ে কাজ করতেন নভোজিৎ।

বাবা যখন ট্রেইনার

যুবরাজের মারকুটে ব্যাটিংয়ের পেছনে তার বাবার অবদানই হয়তো সবচেয়ে বেশি। নেটে টেনিস বল দিয়ে যুবরাজকে ট্রেনিং করাতেন যোগরাজ। কিশোর বয়সেই বাবার উচ্চগতির বল খেলার কারণেই হয়তো পেস বোলারদের বিরুদ্ধে দাপটের সাথে ব্যাট চালানো শিখে ফেলেন যুবরাজ৷ ক্রিকেটার বাবাই যুবিকে হাতেকলমে প্রত্যেকদিন অনুশীলন করাতেন৷ অবশ্য কিশোর বয়সেই এই ক্রিকেটার মুম্বাইয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন একটি স্থানীয় ক্রিকেট একাডেমির অধীনে ট্রেইনিং করার জন্য।

যুবরাজের ডাকনাম

ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই নজরকাঁড়ানো পারফরম্যান্স দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নেন যুবরাজ। ‘যুবি’ নামেই সমর্থকদের কাছে যুবরাজের পরিচিতি। ‘যুবরাজ’ নামটির সাথেই জড়িয়ে আছে রাজার ছাপ, ঠিক সেই কারণেই হয়তো যুবরাজকে ‘প্রিন্স অব ইন্ডিয়ান ক্রিকেট’ নামে ডাকা হয়।

ক্যারিয়ারের শুরু

মাত্র ১৩ বছর বয়সেই ১৯৯৫ সালে যুবরাজ সিং পাঞ্জাবের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে খেলেন৷ পাঞ্জাবের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলার সময় হিমাচল প্রদেশের বিরুদ্ধে ১৩৭ রানের একটি অবিস্মরণীয় ইনিংস খেলেন এই ক্রিকেটার। মূলত সেই ইনিংসের জের ধরেই ক্রিকেটাঙ্গনে যুবরাজের পরিচিতি।

যুবরাজ সিং; Source: Getty Images

১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে উড়িষ্যার বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফিতে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে অভিষিক্ত হন যুবরাজ। অনূর্ধ্ব-১৯ কোচবিহার ট্রফিতে বিহারের বিপক্ষে ৩৫৮ রান করে পুরো ভারত জুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন এই ক্রিকেটার। রঞ্জি ট্রফির ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে হরিয়ানার সাথে ১৪৯ রানের ইনিংস খেলে ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের আগমনী বার্তার জানান দেন যুবি।

টি টোয়েন্টির যুবরাজ

মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে যুবরাজ সিংয়ের জুড়ি মেলা ভার৷ ইংল্যান্ডের পেসার স্টুয়ার্ট ব্রডের ১ ওভার থেকেই ৩৬ রান তোলেন যুবি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে অনন্য এই কীর্তি গড়েন যুবরাজ। এই তারকা ক্রিকেটারের আগে টি টোয়েন্টি ইতিহাসে ৬ বলে ৬ ছক্কা মারার রেকর্ড অন্য কোনো ব্যাটসম্যান নিজের নামে গড়তে পারেননি।

যুবরাজ সিং; Source: Getty Images

টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে দ্রুততম অর্ধশতকের ইনিংস আসে যুবরাজের ব্যাট থেকে। মাত্র ১২ বলে অর্ধশত করার রেকর্ড গড়েন যুবি। ২০০৭ টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৩০ বলে ৭০ রানের ইনিংস খেলে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন এই ক্রিকেটার। সেই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ছক্কারও (১১৯ মিটার) রেকর্ড যুবরাজের।

অনূর্ধ্ব-১৯ দলে যুবরাজের পারফরম্যান্স

মোহাম্মদ কাইফের অধিনায়কত্বে ২০০০ সালে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতে ভারত। ব্যাট, বলে সমান জ্যোতি ছড়িয়ে সেবারের বিশ্বকাপে নিজের জাত বেশ ভালোভাবেই চিনিয়েছিলেন যুবি। অস্ট্রেলিয়ার সাথে সেমিফাইনালে মাত্র ২৫ বলে ৫৮ রানের একটি ইনিংস খেলেন সদ্য সাবেক হওয়া এই ক্রিকেটার। এছাড়াও টুর্নামেন্টের শুরুতেই ৬২ বলে ৬৮ রানের আরেকটি স্মরণীয় ইনিংস আসে যুবরাজের ব্যাট থেকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই টুর্নামেন্টেই ৩৬ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট নেন এই তারকা ক্রিকেটার।

অভিষেক

বয়স ভিত্তিক দলগুলোতে ভালো পারফরম্যান্স করায় ভারতের জাতীয় দলের হয়ে খেলতে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি যুবরাজকে। ২০০০ সালে আইসিসি নকআউট ট্রফিতে কেনিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে অভিষিক্ত হন এই ক্রিকেটার। সেই ম্যাচে অবশ্য ব্যাট করার সুযোগই মেলেনি যুবরাজের। সেই টুর্নামেন্টর কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮০ বলে ৮৪ রানের ইনিংস খেলে আলোচনায় আসেন যুবরাজ।

ন্যাটওয়েস্ট জয়

২০০২ সালে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে অসাধারণ পারফর্ম করার কারণে ক্যারিয়ারের মোর ঘুরে যায় যুবরাজের। সেই সিরিজের শেষ ম্যাচে ভারতকে ৩২৬ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দেয় ইংল্যান্ড। ধুঁকতে থাকা ভারত স্কোরবোর্ডে ১৪৬ রান তুলতেই হারায় ৫ উইকেট। ২৪তম ওভারের শেষে মোহাম্মদ কাইফ এবং যুবরাজ সিং উইকেটে আসার পর জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ভারত।

যুবরাজ সিং; Source: Getty Images

ষষ্ঠ উইকেটে এই দুই ব্যাটসম্যান মিলে ১২১ রানের অসাধারণ একটি জুটি বাঁধেন। আউট হওয়ার আগে যুবরাজের ব্যাট থেকে আসে ৬৩ বলে ৬৯ রানের ম্যাচজয়ী একটি ইনিংস। যুবির ব্যাটিংয়ের উপর ভর করে ২ উইকেটের ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে যায় ভারত। মূলত সেই ইনিংসের পর থেকে ভারতীয় দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেন এই তারকা।

featured Photo credit: Getty Images