পারফরম্যান্স বাড়াতে ড্রাগস গ্রহণ করার বিষয়টি ক্রীড়াঙ্গনে বেশ আলোচিত। বিভিন্ন সময়ে কিংবদন্তি সব ক্রিকেটারদেরও ড্রাগস গ্রহণ করতে দেখা গেছে। এবং ডোপিং টেস্টে ব্যর্থ হয়ে অনেক ক্রিকেটারই নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন। এর ফলে প্রতিটি ক্রিকেটারই বেশ সমালোচনার সম্মুখীন হয়ে থাকেন, হারিয়ে ফেলেন অর্জিত সব খ্যাতি এবং ভক্তরাও তাদের প্রিয় ক্রিকেটারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

তবে কখনো কখনো অনেক ক্রিকেটার নিজের অজান্তেই বিভিন্ন কারণে ঔষধ সেবন করার পর ডোপ টেস্টে ব্যর্থ হয়ে থাকেন। আসুন জেনে নিই ডোপিংয়ে নিষেধাজ্ঞায় পড়া ছয় ক্রিকেটার সম্পর্কে।

৬. উপল থারাঙ্গা (শ্রীলঙ্কা)

শ্রীলঙ্কা দলের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ডোপ টেস্টে ব্যর্থ হন উপল থারাঙ্গা। ২০১১ সালের বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড বনাম শ্রীলঙ্কার সেমি-ফাইনাল ম্যাচের পর ডোপিং টেস্ট করার জন্য উপল থারাঙ্গার মূত্রের নমুনা নেওয়া হয়েছিল, যা WADA কর্তৃক অনুমোদিত পরীক্ষাগারে টেস্ট করা হয়।

Image result for upul tharanga

উপল থারাঙ্গা; Source: Sri Lanka Mirror

পরীক্ষা শেষে প্রেডনিসন ও প্রেডনিসোলন এই দুটি ড্রাগের অস্তিত্ব পাওয়া যায় যা WADA কর্তৃক অনুমোদিত তালিকা অনুযায়ী কোনো প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। যদিও পরবর্তীতে জানা যায়, হাঁপানি রোগের কারণে থারাঙ্কা উক্ত ড্রাগস দুটো সেবন করেছিলেন। এরপরও ডোপ টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার কারণে আইসিসি উপল থারাঙ্গাকে তিন মাসের জন্য আইসিসির সব ধরনের ক্রিকেট এবং ক্রিকেট সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

৫. স্টিফেন ফ্লেমিং (নিউজিল্যান্ড)

নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিংও রয়েছেন এই তালিকায়। অত্যন্ত শান্ত ও নরম মেজাজের এই ক্রিকেটারের নাম এই তালিকায় দেখার পর অনেকেই অবাক হতে পারেন। তবে এটা সত্য যে, ডোপ টেস্টে ইতিবাচক ফলাফলের পর স্টিফেন ফ্লেমিংকেও নিষিদ্ধ ও জরিমানা করা হয়েছিল।

পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য ড্রাগস গ্রহণের কারণে ফ্লেমিংকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। মূলত ১৯৯৪ সালে সতীর্থ ক্রিকেটার ডিওন ন্যাশ ও ম্যাথিউ হার্টের সাথে একত্রে ধূমপানের কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তাকে। যদিও তা ছিল বিনোদনমূলক। ডেনি মরিসনও তাদের সাথে অবস্খান করেছিলেন তবে তিনি ধূমপানে জড়িত ছিলেন না এবং তিনিই ঐ তিন ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন।

Image result for stephen fleming

স্টিফেন ফ্লেমিং; Source: Stuff.co.nz

ধূমপানের বিষয়টি প্রমাণিত হবার পর স্টিফেন ফ্লেমিং, ডিওন ন্যাশ ও ম্যাথিউ হার্টকে ১৭৫ ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে স্টিফেন স্বীকার করেছিলেন, এটির জন্য তাকে কয়েক হাজার ডলার আইনি ফি ব্যয় করতে হয়েছিল এবং স্পন্সরশিপও হারিয়েছিলেন তিনি। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চলমান সিরিজ থেকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তাদের।

৪. শেন ওয়ার্ন (অস্ট্রেলিয়া)

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা লেগ-স্পিনার বোলার ছিলেন শেন ওয়ার্ন। অসাধারণ ঘূর্ণন জাদুতে কত ব্যাটসম্যানকেই না নাস্তানাবুদ করেছেন তিনি। তবে বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি স্পিনার বোলারও ডোপিংয়ের তালিকা থেকে বাদ পড়েননি। ২০০৩ সালে বিশ্বকাপে ডোপিং টেস্টে শেন ওয়ার্নের শরীরে ডিউরেটিক ড্রাগ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি মূলত ওজন হ্রাসকারী ড্রাগ হিসেবে পরিচিত।

Image result for shane warne

শেন ওয়ার্ন; Source: Sunshine Coast Daily

ড্রাগস গ্রহণের প্রমাণ পাওয়ার পর বিশ্বকাপের মাঝ পথেই আরো পরীক্ষার জন্য অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় শেন ওয়ার্নকে। পরে ওয়ার্ন এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তাকে এক বছরের নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছিল ক্রিকেট বোর্ড। এরপর ২০০৪ সালে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে জাতীয় দলে ফেরার পর থেকে ২০০৭ সালে অবসরের আগ পর্যন্ত দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন শেন ওয়ার্ন।

৩. মোহাম্মদ আসিফ (পাকিস্তান)

পাকিস্তানের এক সময়ের অন্যতম সেরা ও দ্রুতগতি সম্পন্ন বোলার ছিলেন মোহাম্মদ আফিস। ব্যতিক্রমধর্মী এই বোলার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার অসাধারণ বোলিংয়ে সবার নজর কেড়েছিলেন। তবে বিভিন্ন বির্তকিত কারণে সবসময়ই তিনি শিরোনামের শীর্ষে অবস্থান করতেন।

Image result for mohammad asif

মোহাম্মদ আসিফ; Source: Firstpost

২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে আরেক সতীর্থ বোলার শোয়েব আক্তারের সাথে ডোপিং টেস্টে ব্যর্থ হয়ে সর্বপ্রথম নিষিদ্ধ হন। তাকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এরপর আইপিএলের প্রথম আসরেও ডোপ টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ড্রাগস ট্রাইব্যুনাল তাকে এক বছরের নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছিল। এমনকি ২০০৮ সালে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে মানিব্যাগে অবৈধ ড্রাগস রাখার সন্দেহে আটক করা হয়েছিল মোহাম্মদ আসিফকে।

২. শোয়েব আক্তার (পাকিস্তান)

বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ দ্রুতগতি সম্পন্ন বোলারদের অন্যতম একজন শোয়েব আক্তার। তার গতির সামনে বিশ্ব ক্রিকেটের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানরাও নাস্তানাবুদ হতেন। তবে ২০০৬ সালে নিষিদ্ধ ড্রাগ অ্যানাবলিক স্টেরোয়েড ন্যানড্রোলন ব্যবহারের কারণে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড কর্তৃক তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি ড্রাগ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এবং শোয়েব আক্তারের ড্রাগ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। তার সাথে পাকিস্তানের আরেক বোলার মোহাম্মদ আসিফও ছিলেন।

Image result for shoaib akhtar

শোয়েব আক্তার; Source: India Today

২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তান দলের স্কোয়াডে এই দুই ক্রিকেটার থাকলেও উক্ত ঘটনার জন্য টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগের দিনই দল থেকে নিষিদ্ধ করা হয় শোয়েব আক্তার ও মোহাম্মদ আসিফকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মোহাম্মদ আসিফকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হলেও শোয়েব আক্তারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল দুই বছরের জন্য।

১. আন্দ্রে রাসেল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেশসেরা অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেল যেন দেশেরই নয়, বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা একজন হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরমেটে যে কোনো বোলারের বল তুলোধুনো করে যে কোনো পরিস্থিতি থেকে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়াই যেন তার প্রধান কাজ। শুধু ব্যাটিংয়েই নয়, বোলিং ও অসাধারণ ফিল্ডিংয়েও দলের হয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার।

Image result for andre russell

আন্দ্রে রাসেল; Source: The National

তবে ২০১৭ সালে কিংস্টনের একটি এন্টি-ডোপিং প্যানেল কর্তৃক শর্ত লঙ্ঘনের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় আন্দ্রে রাসেলকে। নিষেধাজ্ঞাটা ৩১ জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০১৭ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০১৭ সালের আইপিএল ও পিএসএলের টি-টোয়েন্টি লীগে অংশগ্রহণ করতে পারেননি তিনি। ডোপিংয়ের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বেশ দুর্দান্তভাবেই ফিরেছিলেন আন্দ্রে রাসেল। যা তাকে বর্তমান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম সেরা একজন ক্রিকেটারে পরিণত করেছে।

Featured Image Source: Cricket Australia