বিশ্বকাপ নামক ক্রিকেটের মহামঞ্চের পথ চলা শুরু হয় ১৯৭৫ সাল থেকে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি চার বছর অন্তর ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি অধীনে এক এক বার এক এক দেশে আয়োজন হয়ে আসছে এই টুর্নামেন্ট। সে নিয়ম অনুযায়ী ১৯৮৩ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আসরের আয়োজকের দায়িত্ব পালন করে ইংল্যান্ড।

Image Source: icc

এই আসরটিতে অংশগ্রহণকারী দলগুলো ছিল ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও জিম্বাবুয়ে। পুরো টুর্নামেন্ট রাউন্ড রবিন ও নক আউট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ইনিংসের দৈর্ঘ্য ছিল ৬০ ওভার এবং প্রতিটি দলের জার্সির কালার ছিল সাদা। লাল বলে পুরো টুর্নামেন্টের খেলা চলে।

চলুন জেনে নেওয়া যাক ১৯৮৩ বিশ্বকাপ সম্পর্কে আরও কিছু অজানা তথ্য।

চ্যাম্পিয়ন

ভারত

বর্তমান সময়ের ভারতীয় ক্রিকেট দল আর প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের মধ্যে পার্থক্যটা ছিল মুদ্রার এপিঠ ওপিঠের মতো। সে সময়ে তেমন জনপ্রিয়তা ছিল না ভারতের। আসরটিতে তাদের অবস্থান ছিল গ্রুপ ‘বি’ তে। একই গ্রুপে ছিল দুই বারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া ও জিম্বাবুয়ে। গ্রুপ পর্বের খেলাগুলো ডাবল রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে হওয়ায় এক দল অন্য দলের সাথে খেলতে হয়েছে দুইটি করে ম্যাচ।

Image Source: icc

অধিনায়ক কপিল দেবের
নেতৃত্বে গ্রুপ পর্বের প্রথম খেলায় অন্যতম শক্তিশালী দল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩৪ রানে
হারিয়ে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করে ভারতীয়রা। যদিও সে জয়ের প্রতিশোধ গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয়
দেখায় ৬৬ রানে বিশাল জয় দিয়ে তুলে নেয় উইন্ডিজরা। গ্রুপ পর্বে ভারতীয়দের সামনে
আরেক কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ম্যাচে অজিদের কাছে ১৬২ রানের বিশাল
ব্যবধানে পরাজিত হলেও দ্বিতীয় বারের দেখায় ১১৮ রানের ব্যবধানে জয় তুলে নেয় কপিল
দেবের দল।

জিম্বাবুয়ের সাথে গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচেই জয় পায় ভারত। প্রথম ম্যাচে পাঁচ উইকেটে ও দ্বিতীয় ম্যাচে ৩১ রানের জয়ে সেমিফাইনালের সমীকরণ সহজ হয়ে যায় তাদের। গ্রুপ পর্বের ছয় খেলার চারটিতে জয় নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে থেকে কপিল দেবের নেতৃত্বে প্রথম বারের মত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পোঁছে যায় তারা। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হয় ১৯৭৯ বিশ্বকাপের রানার আপ ইংল্যান্ড। ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে আগে ব্যাট করে সবকয়টি উইকেট হারিয়ে ২১৩ রান সংগ্রহ করে ইংলিশরা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে মাত্র চার উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পোঁছে যায় ভারত।

Image Source: icc

টানা তিন বার বিশ্ব সেরা হওয়ার লক্ষ্যে ইংল্যান্ডের লডসে ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শক্তি, পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা সবদিক থেকেই ভারতীয়দের চেয়ে এগিয়েছিল ক্যারিবিয়ানরা। তাই হয়তো টসে জিতেই বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ক্যারিবিয় অধিনায়ক। পরিকল্পনা মোতাবেক সফলও হন তিনি। মাত্র ১৮৩ রানে গুটিয়ে যায় ভারতীয়দের ইনিংস। ছোট লক্ষ তাড়া করতে নেমে হোঁচট খায় উইন্ডিজ ব্যাটিং লাইন আপ। ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ১৪০ রানে ধসে যায় ক্যারিবিয়দের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপ।

ভারতীয়দের মধ্যে সফল বোলার ছিলেন সন্দ্বীপ পাতিল ও মদন লাল। দুই জনেই নেন তিনটি করে উইকেট। এই জয়ের মধ্যে দিয়ে ক্রিকেটে নতুন অধ্যায় রচনা করে ভারত। এশিয়ার মধ্যে তারাই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে এবং বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের স্বাদ গ্রহণ করে।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

ডেভিড গাওয়ার(৩৮৪ রান)

১৯৮৩ বিশ্বকাপে ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাফল্য দেখিয়েছেন ডেভিড গাওয়ার। আসরের প্রথম থেকে দুর্দান্ত খেলে দলকে ফাইনালের ধারপ্রান্তে নিয়ে যান তিনি। ওই আসরে ইংলিশদের হয়ে সাত ম্যাচ খেলেন এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান, যাতে একটি শতক ও একটি অর্ধ শতক পূর্ন করে আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে নেন।

Image Source: icc

বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তাদের মুখোমুখি হয় নিউজিল্যান্ড, ম্যাচটিতে ৬টি চারের সহযোগিতায় ৬২ বলে ৩৯ রানের এক ধৈর্যশীল ইনিংস খেলেন গাওয়ার। ওই আসরের তার একমাত্র শতকটি আসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে। ১২ চার আর ৫ ছয়ের মারকুটে ব্যাটিংয়ে ১২০ বলে ১৩০ রান করেন তিনি। গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬টি চারের সহযোগিতায় ৭২ বলে করেন ৪৮ রান।

গ্রুপ পর্বে কিউইদের সাথে দ্বিতীয়বারের দেখায় অসাধারণ ব্যাটিং করেন গাওয়ার। ৬টি চার আর ৪টি ছয়ের বাউন্ডারিতে ৯৬ বলে অপরাজিত থেকে করেন ৯২ রান। পাকিস্তানের সাথে করেন ৪৮ বলে ৩১ রান এবং গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৪ বলে ২৭ রান করেন তিনি। গ্রুপ পর্বে ভালো করলেও সেমি ফাইনালে এসে ভারতের বিপক্ষে আশানুরূপ দ্যুতি ছড়াতে পারেননি গাওয়ার। গুরত্বপূর্ণ ম্যাচেটিতে ৩০ বল খেলে মাত্র ১৭ রান করে সাঁজ ঘরে ফিরে যান তিনি।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি

রজার বিনি(১৮ উইকেট)

‘৮৩ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিং দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেন আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি রজার বিনি। ভারতীয় দলের এই ডান হাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার ম্যাচটিতে ১২ ওভার বল করে ৪৮ রান দিয়ে নেন ৩টি মূল্যবান উইকেট। পুরো টুর্নামেন্টে তার সেরা বোলিং ফিগার ছিল গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ম্যাচটিতে ৮ ওভার বল করে ২৯ রান দিয়ে নেন ৪টি উইকেট।

Image Source: icc

গ্রুপ পর্বে জিম্বাবুয়ের
বিপক্ষে দুই বারের দেখায় ২টি করে মোট ৪টি উইকেট নেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে নেন মাত্র
১টি উইকেট এবং উইন্ডিজদের সাথে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে ১২ ওভার বল করে ৭১ রান
দিয়ে নেন ৩টি উইকেট। গ্রুপ পর্ব শেষে ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে
অসাধারণ বোলিং করে ভারতকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য
করেন তিনি। ম্যাচটিতে ১২ ওভার বল করে ৪৩ রান দিয়ে নেন ২টি মূল্যবান উইকেট।

ফাইনালে তাদের মুখোমুখি
হয় গ্রুপ পর্বে দুই বার মোকাবেলা করে আসা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে। দুই ম্যাচের
দুইটিতেই ৩টি করে উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। ফাইনালে এসেও অসাধারণ বোলিং করে উইন্ডিজ
ব্যাটসম্যানদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন বিনি। ১০ ওভার বল করে ২৩ রান দিয়ে নেন ১টি
উইকেট। ওই আসরে ভারত বিশ্বকাপ জয়ের পিছনে বল হাতে অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি।

সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান

কপিল দেব(অপরাজিত ১৭৫
রান)

বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের অধিনায়ক কপিল দেব জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আসরের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রানের ইনিংসটি খেলেন। ৬টি ছয় আর ১৬টি চারের বাউন্ডারিতে ১৩৮ বলে অপরাজিত থেকে ১৭৫ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি। তার এই ইনিংটি তখনকার সময়ের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রানের ইতিহাস গড়ে। রেকর্ডটি শুধু বিশ্বকাপের জন্যই ছিল না, তা তখনকার এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রানের রেকর্ডও গড়ে।

সেরা বোলিং ফিগার

উইনস্টন ডেভিড(৭/৫১)

উইন্ডিজ ফাস্ট বোলার উইনস্টন ডেভিড এই অসাধারণ বোলিং ফিগার দিয়ে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক ইনিংসে ৭ উইকেট শিকারের কৃত্তি গড়েন। তার এই বোলিং ফিগারটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ডেভিডের এই রেকর্ড ২০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ২০০৩ সালে  গ্লেন ম্যাকগ্রা নামিবিয়ার বিপক্ষে তার এই রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ডের জন্ম দেন।

Featured Image: icc