ক্রিকেট বিশ্বকাপের ৬ষ্ঠ আসর অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। যা ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে আয়োজন করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত টুর্নামেন্টের স্থায়িত্ব হয়। ৬ষ্ঠ আসরটিতেও আগের আসরগুলোর ন্যায় ব্যবসায়িক অংশীদারীত্বের কারণে নামে পরিবর্তন আসে। ১৯৯২ এর বিশ্বকাপ বেনসন এন্ড হেজেস বিশ্বকাপ নামে পরিচিতি লাভ করলেও ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অংশীদারীত্বের কারণে নাম দেওয়া হয় উইলস বিশ্বকাপ।

Image Source: icc

১৯৯৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ছিলো ১২টি। বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটে- সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ড ও কেনিয়ার। আর বাকি দলগুলো হলো-অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও ইংল্যান্ড। এই টুর্নামেন্টের খেলা গুলো রাউন্ড রবিন ও নক আউট পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি ইনিংসের দৈর্ঘ্য ছিল ৫০ ওভার।

চলুন বিশ্বকাপের এই ৬ষ্ঠ আসর সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

চ্যাম্পিয়ন

শ্রীলঙ্কা

১৯৯৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা লাভ করে শ্রীলঙ্কা। আসরের প্রথম থেকেই তারা  দুর্দান্ত পারফর্ম করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। গ্রুপ পর্ব, কোয়ালিফাইং রাউন্ড ও সেমিফাইনাল কোথাও কোন হার ছাড়াই সফলভাবে বিশ্বকাপ শেষ করে অর্জুনা রানাতুঙ্গার দল। ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্বাগতিক কিংবা সহ-স্বাগতিক দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের প্রথম ঘটনার জন্ম দেয় শ্রীলঙ্কা।

Image Source: espncricinfo

বিশ্বকাপে  অবস্থান ছিল অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ার সাথে গ্রুপ ‘এ’ তে। গ্রুপ পর্বের খেলায় অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার আপত্তি জানায়, ফলে দুইটি খেলায় শ্রীলঙ্কা জয় পায়। আর বাকি তিন খেলার তিনটিতেও যায় পায় লঙ্কানরা। ফলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে রানাতুঙ্গার দল।

Image Source: espncricinfo

কোয়ার্টার ফাইনালেও তারা ইংলিশদের হারিয়ে দেয় এবং ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে সেমিফাইনালে ভারতকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন টিকিয়ে রাখে। পাকিস্তানের লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে স্বপ্নের ফাইনালে তাদের মুখোমুখি হয় অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচটিতে টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় লঙ্কান অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা।

Image Source: espncricinfo

বিশ্বকাপের আগের পাঁচ আসরের ফাইনালে আগে ব্যাট করা দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো। টসে জিতে সেই সমীকরণকে কর্ণপাতই করলেন না লঙ্কান কাপ্তান। ব্যাট করতে নেমে ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৪১ রান সংগ্রহ করে অজিরা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে অরবিন্দ ডি সিলভার অপরাজিত ১০৭ রানের উপর ভর করে ৪৬ ওভার ২ বলে জয়ের বন্দরে পোঁছে যায় লঙ্কানরা। সেই সাথে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের স্বাদ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা।

সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী

শচীন টেন্ডুলকার(৫২৩ রান)

কেনিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক শতক দিয়ে সেবার বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেন শচীন টেন্ডুলকার। ১৩৮ বলে অপরাজিত ১২৭ রান করেন তিনি। টুর্নামেন্টের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় সব ম্যাচেই তারে ব্যাটে ভর করে জয় পায় ভারত। পুরো টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচ খেলে দুইটি শতক আর ৩ অর্ধ শতকে ৫২৩ রান করেন তিনি। সেই সাথে আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকার প্রথম স্থান দখল করে নেন।

Image Source: espncricinfo

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফাইনালে সর্বোচ্চ ১৩৭ রান করেন। তাছাড়া গ্রুপ পর্বে উইন্ডিজদের বিপক্ষে ৭০ রান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৯০ রান, কোয়ার্টার ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩১ রান ও সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেন ৬৬ রান।

সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি

অনিল কুম্বলে(১৫ উইকেট)

কুম্বলে ‘৯৬ বিশ্বকাপে ৭ ম্যাচ খেলে ১৫ উইকেট শিকার করে শীর্ষ উইকেট শিকারির তালিকার প্রথম স্থান দখল করে নেন। আসরে তার সেরা বোলিং ফিগার ছিল গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে কেনিয়ার বিপক্ষে। যাতে তিনি ২৮ রান দিয়ে ৩টি উইকেট নেন। তা ছাড়া গ্রুপ পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩টি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১টি, শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নেন ২টি করে উইকেট।

Image Source: espncricinfo

কোয়ার্টার ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি দুর্দান্ত বোলিং করেন। ম্যাচটিতে ৪৮ রান দিয়ে নেন ৩টি উইকেট। সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫১ রান দিয়ে নেন ১ উইকেট।

ম্যান অব দ্যা সিরিজ

সনাৎ জয়সুরিয়া

১৯৯৬ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক কিংবা উইকেট শিকারির তালিকার সেরা পাঁচে না থেকেও সেবার টুর্নামেন্ট সেরার পুরষ্কার নিজের করে নিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার সনাথ জয়সুরিয়া। তার অলরাউন্ডিং নৈপুণ্যের কারণেই টুর্নামেন্ট সেরার পুরষ্কার জিতেন তিনি। সে আসরে জয়সুরিয়া ছয় ম্যাচ খেলে ৭টি উইকেটের পাশাপাশি ব্যাট হাতে করেন ২২১ রান।

Image Source: espncricinfo

তার সেরা বোলিং ফিগার ছিল সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে। যেখানে ৭ ওভার বল করে ১২ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন আর ব্যাট হাতে সর্বোচ্চ স্কোর কোয়ার্টচর ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৪ বলে ৮২ রান

সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান

গ্যারি কার্স্টেন(অপরাজিত ১৮৮ রান)

Image Source: cricbuzz

গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে মাঠে নামে দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচটিতে আগে ব্যাট করতে নেমে বামহাতি ওপেনার গ্যারি কার্স্টেনের দুর্দান্ত দেড়শত রানের ইনিংসে বিশাল সংগ্রহ পায় প্রোটিয়ারা। কার্স্টেনের সে ইনিংসটি ছিল পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান। ১৫৯ বলের ইনিংসটিতে ৪ ছয় ও ১৩ চারে ১৮৮ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি।

সেরা বোলিং ফিগার

শাওকত দুকনবলা(৫/২৯)

Image Source: espncricinfo

শাওকাত দুকনবলা ছিলেন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে আসা সংযুক্ত আরব আমিরাত দলের ডানহাতি অফ ব্রেক বোলার। তার অসাধারণ বোলিং বেলকিতে আসরের এক মাত্র সান্ত্বনার জয় পায় আমিরাত। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেটের দুর্দান্ত বোলিং ডাচদের ব্যাটিং লাইনআপ নড়বড়ে করে দেয়। ম্যাচটিতে আমিরাত ৭ উইকেটের ব্যাধানে জয় পায়।

Featured Image: Getty Images