বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় টি টোয়েন্টি ক্রিকেট। আর এই সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে বিশ্বকাপের পরই জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। অর্থ, জৌলুস, চোখ ধাঁধানো সব পারফরম্যান্স মিলিয়ে আইপিএল ক্রিকেটের এক অনন্য টুর্নামেন্ট। এবারের আসরেও দুর্দান্ত কিছু ম্যাচ ও পারফরম্যান্সের মাধ্যমে শেষ হয়েছে আইপিএল। ফাইনালে মহেন্দ্র সিং ধোনির চেন্নাই সুপার কিংসকে মাত্র এক রানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স।

টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের এই আসর থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর। ৩০ মে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের আগে বেশ কয়েকজনের ক্রিকেটারের ফর্ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিয়েছে আইপিএল। যদিও টি টোয়েন্টি ফরম্যাট আর ওডিআইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের প্রধান অস্ত্র হলো তার নিজের আত্মবিশ্বাস। আইপিএলের প্রতিটি আসর থেকে অনেক খেলোয়াড়ের সম্পর্কে জানা যায় এবং শেখা যায়। চলুন জেনে নেওয়া যাক আইপিএলের এবারের আসর আমাদের কী জানান দিলো।

বেয়ারস্টো এবং ওয়ার্নারের দুর্দান্ত ব্যাটিং

এবারের আইপিএলে ইংলিশ উইকেটরক্ষক জনি বেয়ারস্টোর পারফরম্যান্স ছিল অনবদ্য। তাকে ২.৫ লাখ ডলারের কম মূল্যে দলে ভেড়ায় সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ। কিন্তু তার পারফরম্যান্স ছিল বেশ চড়া মূল্যের। ২৯ বছর বয়সী এই ইংলিশ ক্রিকেটার ১০ ম্যাচ খেলে ৪৪৫ রান করেছেন। এর মধ্যে এবারের আইপিএলে সর্বোচ্চ ৫৬ বলে ১১৪ রানের ইনিংসটিও তিনিই খেলেছেন। মাত্র ৫২ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করে আসরের দ্রুততম সেঞ্চুরির মালিকও বেয়ারস্টো।

জনি বেয়ারস্টো এবং ডেভিড ওয়ার্নার; Image Source: telegraph.co.uk

বেয়ারস্টোর সাথে দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন তার জাতীয় দলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার বামহাতি ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার। তাদের দুজনের জুটি এবারের আসরের অন্যতম সেরা জুটি। হায়দ্রাবাদের হয়ে তারা তিন ম্যাচে ১০০ রানের জুটি গড়েন। এছাড়া রয়্যাল চ্যালেজার্স বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে তারা দুইজন আইপিএলের রেকর্ড ১৮৫ রানের ওপেনিং পার্টনারশিপ গড়েন।

ইংল্যান্ডের অন্য খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স

ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে মঈন আলি, জস বাটলার, জো ডেনলি এবং বেন স্টোকস আইপিএলে অংশ নেন। এর মধ্যে রাজস্থান রয়্যালসের ওপেনার বাটলার বিতর্কিত এক আউটের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেন। রবীচন্দ্রন অশ্বিন তাকে ‘মানকাদ আউট’ করেন। তবে এর পরও এই ইংলিশ হার্ডহিটার আট ম্যাচ খেলে ১৫১.৭০ স্ট্রাইক রেটে ৩১১ রান করেছেন। এর মধ্যে তিনি এবারের আসরে এক ওভারে সর্বোচ্চ ২৮ রান নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।

মানকাদ আউটের পর জস বাটলার ও অশ্বিন; Image Source: dnaindia.com

এদিকে ইংলিশ অলরাউন্ডার মঈন আলি আসরের শুরুতে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে ফর্মহীনতায় ভুগেছেন। প্রথম ছয় ম্যাচে তার ব্যাটিং অর্ডার নিয়েও বেশ পরীক্ষা নিরীক্ষা চলেছে। ফলে তিনি এই ছয় ম্যাচে ব্যাট হাতে করেছেন মাত্র ৭৪ রান। তবে শেষের চার ইনিংসে তিনি ১৪৬ রান করেন। এর মধ্যে তার অর্ধ শতক ছিল দুইটি। তবে বল হাতে মঈন আলি বেশ সফল ছিলেন। পুরো আসরে তার ইকোনমি রেট মাত্র ৬.৭৬। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের দলে বিরাট কোহলি ও এবিডি ভিলিয়ার্সের মতো খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও পয়েন্ট টেবিলের সর্বশেষ অবস্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে।

জো ডেনলিকে দলে ভেড়ায় শাহরুখ খানের কেকেআর। কিন্তু তাকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি। পুরো আসরে তিনি মাত্র এক ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই ম্যাচে তিনি কোনো রান না করেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন। তাকে এই ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে বেন স্টোকসের গল্পটা একটু ভিন্ন।

শেষ ওভারের খলনায়ক স্টোকস

২০১৬ সালে ইডেন গার্ডেনে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল দিয়ে স্টোকসের খলনায়ক বনে যাওয়া শুরু। সেই ম্যাচে উইন্ডিজ তারকা কার্লোস ব্রাথওয়েট টানা চার বলে চার ছয় মেরে দলকে বিশ্বকাপ এনে দেন। এরপর থেকে স্টোকসকে যেন শেষ ওভারের দুঃস্বপ্ন পিছু ছাড়ছে না। যদিও তিনি ২০১৭ সালের আইপিএলে সবচেয়ে দামী বিদেশি খেলোয়াড়ের তকমা পান। এবং সেই আসরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে দলকে ফাইনালে নিয়ে যান। কিন্তু সর্বশেষ দুই আসরে স্টোকস তার নামের সুবিচার করতে পারেননি।

‘সুপার ফ্লপ’ বেন স্টোকস; Image Source: AFP

এবারের আসরে তিনি আবারো নিজের দলকে শেষ ওভারের দুঃস্বপ্ন উপহার দেন। জয়পুরে রাজস্থান তার ঘরের মাঠে চেন্নাইয়ের মুখোমুখি হয়। শেষ ওভারে বল করতে এসে ১৮ রান দিয়ে দলের ভরাডুবি ঘটান। আরেক ম্যাচে তিনি শেষ ওভারে ফ্রি হিট এবং ওয়াইডসহ ২১ রান দেন। এবারের পুরো আসরে স্টোকস একেবারে ‘সুপার ফ্লপ’। নয় ম্যাচ খেলে তিনি করেছেন মাত্র ১২৪ রান। এর মধ্যে অর্ধ শতক নেই একটিও।

বিশ্বকাপের আগেই ফর্মে ফিরেছেন ওয়ার্নার-স্মিথ

দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে টেস্টে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে এক বছর নিষিদ্ধ হন ডেভিড ওয়ার্নার এবং স্টিভেন স্মিথ। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে তারা দুইজন আইপিএল দিয়ে আবারো মাঠে ফিরেছেন। আসছে বিশ্বকাপে তাদের জাতীয় দলে দ্বিতীয়বারের মতো অভিষেক হতে চলেছে। এর আগে তাদের দুজনেরই ফর্মে ফেরা প্রয়োজন ছিল। তারা দুইজনই সেটা করতে সক্ষম হয়েছেন।

ডেভিড ওয়ার্নার এবং স্টিভেন স্মিথ; Image Source: cricket.com.au

ডেভিড ওয়ার্নার এবারের আইপিএল শেষ করেছেন আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে। মোট ১২ ইনিংসে তিনি এক সেঞ্চুরি এবং আট হাফ সেঞ্চুরিতে ৬৯২ রান করেছেন। স্ট্রাইক রেট ছিল ১৪৩.৮৬। স্মিথ অবশ্য ওয়ার্নারের মতো নজর কাড়তে পারেননি। এরপরও তিনি ১০ ইনিংস খেলে ১১৬ স্ট্রাইক রেটে ৩১৯ রান করেছেন। এছাড়া ব্যাট হাতে অজিঙ্কা রাহানে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি অধিনায়কত্ব পান। তার অধীনে রাজস্থান পাঁচ ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জয় পেয়েছে।

মনে রাখতে হবে আন্দ্রে রাসেলকে

কেকেআর তারকা আন্দ্রে রাসেল এবারের আইপিএলে সর্বমোট ২৪৯টি বল মোকাবেলা করেছেন। এর মধ্যে ছক্কা হাকিয়েছেন ৫২টি। তার এই ছোট পরিসংখ্যানটি প্রমাণ করে তিনি কতটা ধ্বংসাত্মক ব্যাটিং করতে পারেন। ৩১ বছর বয়সী এই তারকা ডোপিংয়ের অপরাধে এক বছর মাঠের বাইরে ছিলেন। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে এসে রাজকীয় পারফরম্যান্স উপহার দিচ্ছেন।

দানবীয় ইনিংস খেলেন আন্দ্রে রাসেল; Image Source: AFP

এবারের আইপিএলে সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটের মালিক আন্দ্রে রাসেল। ২০৪.৮১ স্ট্রাইক রেটের পাশাপাশি এবারের আসরে এক ওভারে সর্বোচ্চ ২৮ রান নেওয়ার রেকর্ড গড়েন। তার একক পারফরম্যান্স ভর করে কেকেআর বেশ কয়েকটি ম্যাচে জয় পেয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা শেষ চারে জায়গা নিতে পারেনি। আইপিএল শেষ করে রাসেল এবার জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলবেন। আইপিএলের পর বিশ্বকাপেও তার উপর বাড়তি নজর রাখতে হবে অন্যান্য দলগুলোর।

Featured Image: essentiallysposports.com