ক্রিকেট বিশ্বে ভারত বনাম পাকিস্তানের ম্যাচ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। আর বিশ্বকপের মঞ্চে এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়া মানেই যুদ্ধাংদেহী উৎসবের আমেজ। বৈরি রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিবেশী এই দুই দেশের লড়াই দেখার জন্য মুখিয়ে থাকে সারা বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্ত। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দলের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ৩টি ম্যাচকে নিয়ে সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের আয়োজন।

৩. ২০০৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপ, সেঞ্চুরিয়ান

২০০৩ বিশ্বকাপের ৩৬ তম ম্যাচে পাকিস্তানের মুখোমুখি হয় সৌরভ গাঙ্গুলির ভারত। সেঞ্চুরিয়ানে টসে জিতে আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন পাকিস্তান অধিনায়ক ওয়াকার ইউনুস। অধিনায়কের সিদ্ধান্তটি যে ভুল ছিল না সেটি প্রমাণ করতেই পাকিস্তান নিজেদের ইনিংসের প্রথম ১০ ওভার পার করে কোনো উইকেট না হারিয়েই। ওপেনার সাঈদ আনোয়ার এবং তৌফিক উমর সাবধানী ব্যাটিংয়ে বলের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত রান তোলেন স্কোরবোর্ডে।

পাকিস্তান ইনিংসের প্রথম ধাক্কা আসে ১১তম ওভারে। জহির খানের বল ঠিকমতো বুঝতে না পেরে আউট হন ওপেনার তৌফিক উমর। উমরের বিদায়ের পর উইকেটে আসা আব্দুল রাজ্জাক ওপেনার আনোয়ারকে খানিকক্ষণ সঙ্গ দিলেও মাত্র ১২ রানেই ফেরেন প্যাভিলিয়নে। চতুর্থ উইকেটে নেমে অভিজ্ঞ ইনজামাম উল হক নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি চিরশত্রু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে৷

সাঈদ আনোয়ার; Source: Getty Image

৩ বলে ৬ রান করে ইনজামাম বিদায় নিলে ৯৮ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে পাকিস্তান দল। তবে ওপেনার সাঈদ আনোয়ার নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংসটি সাজিয়ে রেখেছিলেন এই ম্যাচের জন্য হয়তো৷ আনোয়ারের ১০১ রানের ইনিংসটির উপর ভর করে ৭ উইকেট হারিয়ে ২৭৩ রানের পুঁজি পায় পাকিস্তান৷ ভারতীয় বোলারদের মধ্যে জহির খান এবং আশীষ নেহরা নেন ২টি করে উইকেট।

পাকিস্তানের দেয়া ২৭৪ রানের লক্ষ্যে ম্যাচ জিততে শুরু থেকেই বলের সাথে পাল্লা দিয়ে রান তোলার চাপ ছিল ভারতের। তবে পাকিস্তানের শক্তিশালী বোলিং লাইন আপের বিরুদ্ধেও এই কাজটা বেশ সহজেই সেড়ে ফেলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। শুরু থেকেই দ্রুত লয়ে রান তোলা ভারত প্রথম উইকেট হারায় ষষ্ঠ ওভারের চতুর্থ বলে। দলীয় ৫৪ রানে ব্যক্তিগত ২১ রানে আউট হন বীরেন্দর শেবাগ।

শচীন টেন্ডুলকার; Source: Getty Image

প্রথম উইকেটের পতনের পর উইকেটে আসা সৌরভ গাঙ্গুলিকে নিজের শিকারে পরিণত করেন পাকিস্তান অধিনায়ক ওয়াকার ইউনুস। ওয়াকারের বলে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে পড়ে কোনো রান না করে প্রথম বলেই বিদায় নিতে হয় সৌরভকে। টানা দুই উইকেট হারিয়ে খানিকটা ধীরলয়ে ব্যাটিং করে জুটি বাঁধায় মনোযোগ দেন শচীন টেন্ডুলকার এবং মোহাম্মদ কাইফ।

উইকেটের একপ্রান্তে কাইফের থিতু হওয়ার প্রচেষ্টায় ধীরলয়ের ব্যাটিং আর অপর প্রান্তে শচীনের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে জয়ের বন্দরে পৌছে যায় ভারত। ৬০ বলে ৩৫ রান করে কাইফ বিদায় নিলেও টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড় এবং যুবরাজ সিংয়ের ব্যাটিংয়ে ম্যাচ জেতে ভারত। টেন্ডুলকারের ৭৫ বলে ৯৮ রানের ইনিংসটির উপর ভর করে ম্যাচের ২৬ বল বাকি থাকতেই জয় পায় ভারত৷ অসাধারণ ইনিংসটির জন্য ম্যাচসেরার পুরষ্কার ওঠে টেন্ডুলকারের হাতে।

২. ২০১১ বিশ্বকাপ, মোহালি

২০১১ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামে পাকিস্তান। টসে জিতে মোহালিতে আগে ব্যাটিং করে ভারত। ভারতের হয়ে ওপেনার শচীন টেন্ডুলকার ছাড়া অন্য আর কোনো ব্যাটসম্যান অর্ধশতকের দেখা পায়নি। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় তুলে নেয়ার জন্য শচীনের ৮৫ রানের ইনিংসটিই যথেষ্ট ছিল।

নির্ধারিত ৫০ ওভার খেলে ৯ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তানকে ২৬১ রানের লক্ষ্য বেঁধে দেয় ভারত।পাকিস্তানি বোলারদের মধ্যে ওয়াহাব রিয়াজ ৪৬ রানের বিনিময়ে নেন ৫ উইকেট। এছাড়াও সাঈদ আজমল ২টি ও মোহাম্মদ হাফিজ ১টি উইকেট পান।

পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের উল্লাস; Source: Getty Image

মোহালির বোলিং সহায়ক উইকেটে জয়ের জন্য পাকিস্তানের বড় একটি জুটির দরকার ছিল। কিন্ত পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানরা উইকেটে থিতু হয়েও বাজে শট খেলে বিদায় নিয়ে পাকিস্তানের ম্যাচ জেতা কঠিন করে তোলে। ৪৯.৫ ওভারে ২৩১ রানে অলআউট হয় টিম পাকিস্তান। ম্যাচটি ২৯ রানের ব্যবধানে জেতে ভারত। পাকিস্তানের হয়ে স্কোরবোর্ডে সর্বোচ্চ রান আসে মিসবাহ উল হকের ব্যাট থেকে, ৭৬ বলে করেন ৫৬ রান। ভারতকে ম্যাচ জেতাতে সবচেয়ে বড় ইনিংস খেলার জন্য ম্যাচসেরার পুরষ্কার জেতেন শচীন টেন্ডুলকার।

১. ১৯৯৬ বিশ্বকাপ, ব্যাঙ্গালুরু

১৯৯৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ ছিল ভারত বনাম পাকিস্তানের ম্যাচটি৷ গ্রুপ পর্বে নিজেদের সবগুলো ম্যাচ জেতা পাকিস্তান কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয় ভারতের সাথে হেরে। আগে ব্যাটিং করা ভারতকে বড় পুঁজি এনে দেয় ওপেনার নভোজিৎ সিংয়ের ৯৩ রানের ম্যাচজয়ী ইনিংসটি। এছাড়াও শচীন টেন্ডুলকার ৩১ ও অধিনায়ক মোহাম্মদ আজহারউদ্দীন করেন ২৭ রান।

তবে ভারতের লড়াকু পুঁজির পেছনে শেষের দিকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন অজয় জাদেজা। মাত্র ২৫ বল খেলে এই ব্যাটসম্যান স্কোরবোর্ডে নিজের নামের পাশে যোগ করেন ৪৫ রান। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তানকে ম্যাচ জয়ের জন্য ২৮৮ রানের লক্ষ্য দেয় ভারত। পাকিস্তানি বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ওয়াকার ইউনুস এবং মুশতাক আহমেদ নেন ২টি করে উইকেট।

ম্যাচজয়ী ভারত দল; Source: Getty Image

বড় পুঁজি তাড়া করতে নেমে দুই ওপেনার পাকিস্তানকে এনে দেন চমৎকার শুরু। ৮৪ রানে প্রথম উইকেট হারানো পাকিস্তান ৫ উইকেট হারায় ১৮৪ রানে, ম্যাচ হারে ৩৯ রানে। পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইনিংস খেলেন অধিনায়ক আমির সোহাইল, করেন ৪৬ বলে ৫৫ রান। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে অনিল কুম্বলে ও ভেংকটেশ প্রসাদ নেন ৩টি করে উইকেট। ৯৩ রানের ইনিংসটির জন্য ম্যাচসেরার পুরষ্কার জেতেন নভোজিৎ সিং৷

Featured Photo Credit: Getty Image