দরজায় কড়া নাড়ছে ২০১৯ বিশ্বকাপ আসর। ৩০ মে দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম স্বাগতিক ইংল্যান্ডের ম্যাচের মধ্য দিয়ে লন্ডনের ওভালে পর্দা উঠতে যাচ্ছে ক্রিকেটের সর্ববৃহৎ এই আসরের। আসন্ন এই বিশ্বকাপকে সামনে রেখে সারা বিশ্বের ক্রিকেট সমর্থকদের উত্তেজনার যেন কোনো কমতিই নেই! ইতোমধ্যেই প্রত্যেকটি দল এবং খেলোয়াড়দের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে নেমে পড়েছে ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা।

প্রত্যেকেই বিভিন্ন পরিসংখ্যান দিয়ে উপস্থাপন করছে নিজেদের সেরা দলকে। কিন্ত সবসময় তো আর পরিসংখ্যানই শেষ কথা নয়! অতীত পরিসংখ্যানকে তোয়াক্কা না করেই ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দেয়ার মতো ঘটনা ক্রিকেট ইতিহাসে নেহাৎ কম নেই। ক্রিকেট বিশ্বকাপ (ওডিআই) ইতিহাসের এমনই ৫টি আশ্চর্যজনক ঘটনা নিয়েই সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের আয়োজন।

১. আয়ারল্যান্ডের কাছে ইংল্যান্ডের পরাজয় (২০১১)

২০১১ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের ১৫তম ম্যাচে ব্যাঙ্গালোরের চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে আয়ারল্যান্ডের মুখোমুখি হয় অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের ইংল্যান্ড। টসে জিতে আগে ব্যাটিং করে চিন্নাস্বামীতে আয়ারল্যান্ডকে ৩২৬ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য বেঁধে দেয় টিম ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের হয়ে কেভিন পিটারসেন ৫০ বলে ৫৯, জোনাথন ট্রট ৯২ বলে ৯২ এবং ইয়ান বেল করেন ৮৬ বলে ৮২ রান।

কেভিন ও’ব্রায়ান; Source: Cricket Australia

এত বড় লক্ষ্য দাঁড় করিয়েও ম্যাচ জিততে না পারায় ভাগ্যদেবীর উপর দোষ চাপাতেই পারে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারেরা। কিন্ত আইরিশ সমর্থকদের চোখে চিন্নাস্বামীতে ভাগ্যদেবী নয় বরং ধ্বংসের দেবতা রূপে আয়ারল্যান্ডকে ম্যাচ জিতিয়েছে কেভিন ও’ব্রায়েন। মাত্র ৬৩ বলে এই আইরিশ ব্যাটসম্যানের ১১৩ রানের ইনিংসের উপর ভর করে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক জয়টি তুলে নেয় আয়ারল্যান্ড।

মাত্র ৫০ বলে সেদিন সেঞ্চুরি করেছিলেন কেভিন। পুরো ইনিংসে ১৩টি চারের পাশাপাশি মেরেছিলেন আকর্ষণীয় ৬টি ছক্কা। রান আউটের শিকার হয়ে কেভিনের বিদায়ের পর আয়ারল্যান্ডকে পথ হারাতে দেননি জন মুনি। শেষের দিকে মুনির ৩০ বলে ৩৩ রান এবং ট্রেন্ট জনস্টনের ৪ বলে ৭ রানের ইনিংসে জয় পায় আয়ারল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত ৫ বল হাতে রেখেই ম্যাচটি জিতে যায় আয়ারল্যান্ড।

২. কপিল দেবের অবিশ্বাস্য ক্যাচ (১৯৮৩)

১৯৭৫ সালের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপে মাত্র ১টি ম্যাচে জয় পেয়েছিল ভারত। ১৯৭৯ সালের পরের বিশ্বকাপ আসরে কোনো ম্যাচই জিততে পারেনি ভারত। সেই ভারতই কিনা ১৯৮৩ বিশ্বকাপের ট্রফি জিতেছে টানা দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে! ভারতের ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ের সাথে জড়িয়ে আছে ফাইনাল ম্যাচে কপিল দেবের অবিশ্বাস্য এক ক্যাচের কীর্তি।

কপিল দেব; Source: essentiallysports.com

প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং করা ভারতের ১৮৩ রানের লক্ষ্যকে ক্যারিবিয়ানদের আয়ত্তে এনেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি স্যার ভিভ রিচার্ডস। মদন লালের করা একটি বলকে মিড উইকেটের উপর দিয়ে তুলে মারেন ভিভ। কিন্ত মিড অন থেকে পিছন দিকে দৌড়ে অবিশ্বাস্য ক্যাচে ভিভকে তালুবন্দি করেন কপিল। ভিভের বিদায়ের পর ক্যারিবিয়ানরা আর জিততে পারেননি সেই ম্যাচ। কপিলের সেই বিখ্যাত ক্যাচের মধ্য দিয়ে ১৯৮৩ বিশ্বকাপের ট্রফি জেতে ভারত।

৩. শেন ওয়ার্নের ডোপ কেলেঙ্কারি

সমর্থকদের অনেকটা হতাশ করেই ২০০৩ বিশ্বকাপের আগে শেন ওয়ার্ন ঘোষণা দেন এটিই হতে চলেছে তার জীবনের শেষ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ খেলেই নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানতে চেয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি। কিন্ত ওয়ার্ন যেদিন সংবাদ সম্মেলনে তার এই সিদ্ধান্তের কথা সবাইকে জানান তার আগেরদিনই তিনি দিয়েছিলেন ডোপ টেস্ট। আর সেই ডোপ টেস্টের ফলাফলে পজিটিভ প্রমাণিত হন ওয়ার্ন।

শেন ওয়ার্ন; Source: Getty Image

ওয়ার্নের ডোপ টেস্টে ‘ডাইয়ুরেটিকস’ নামক একটি নিষিদ্ধ ড্রাগের উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এর আগেও দুইবার ‘ডাইয়ুরেটিকস’ নেয়ার কথা স্বীকার করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই স্পিনার। ডোপ টেস্টে পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ার কারণে ১২ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হতে হয় ওয়ার্নকে৷ ফলে ২০০৩ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া দলের সাথে ট্রফি জেতার উল্লাসও করা হয়নি ওয়ার্নের।

৪. পাকিস্তান কোচের মৃত্যু রহস্য (২০০৭)

২০০৭ বিশ্বকাপ ছিল চমকে ঠাসা আর উত্তেজনায় ভরপুর এক ক্রীড়া আসর। গ্রুপপর্বে ভারত এবং পাকিস্তানকে হারিয়ে পুরো আসরেরই মোড় ঘুড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ এবং আয়ারল্যান্ড। তবে বাংলাদেশের সাথে হারের লজ্জা ভারত মেনে নিতে পারলেও আয়ারল্যান্ডের সাথে হারের লজ্জা মেনে নিতে পারেননি পাকিস্তান কোচ। আয়ারল্যান্ডের সাথে হারের পরেরদিনে হোটেল রুম থেকে উদ্ধার করা হয় পাকিস্তান কোচ বব উলমারের মৃতদেহ।

ইনজামাম উল হকের সাথে বব উলমার; Source: BBC

উলমারের আকস্মিক মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। কোচিং স্টাফ, টিম ম্যানেজমেন্ট এবং খেলোয়াড়দেরদেকেও জেরার মুখে পড়তে হয় উলমারের মৃত্যুতে। উলমারের মৃত্যু তদন্তকারী কর্মকর্তারা মৃত্যুটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ঘোষণা করলেও অনেকেই বিশ্বাস করেন এই মৃত্যুর পেছনে রয়েছে বাজিকরদের হাত।

৫. হেনরী ওলোঙ্গা এবং অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের প্রতিবাদ (২০০৩)

২০০৩ বিশ্বকাপ ছিল জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম কোনো বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের প্রথম দিনে নামিবিয়ার সাথে ম্যাচের মধ্য দিয়ে পুরো বিশ্বকাপেই বিতর্ক সৃষ্টি করেন জিম্বাবুয়ের হেনরী ওলোঙ্গা এবং অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। বাহুতে কালো রঙের ব্যান্ড লাগিয়ে অদ্ভুত এক প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিলেন এই দুই জিম্বাবুইয়ান।

অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার; Source: DNA INDIA

কালো ব্যান্ড লাগিয়ে প্রতিবাদের মূল কারণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে বিবৃতি দিয়ে দুই ক্রিকেটারই জানিয়ে দেন,

আমরা এটির মাধ্যমে শোক প্রকাশ করছি আমাদের প্রিয় জিম্বাবুয়ের গণতন্ত্রের মৃতুতে। আমরা এটি করছি জিম্বাবুয়েতে মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ণকারীদের কাছে একটা নীরব আবেদন করতে। আমরা প্রার্থনা করি, আমাদের এ ক্ষুদ্র পদক্ষেপ আমাদের জাতির মতৈক্য ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করবে।

ম্যাচের পরপরই একাদশ থেকে বাদ পড়ে যান ওলোঙ্গা। এই দুই ক্রিকেটারের প্রতিবাদের প্রতি সহমত পোষণ করে জিম্বাবুয়ের পরবর্তী ম্যাচগুলিতে কালো ব্যান্ড লাগিয়ে মাঠে আসেন সমর্থকেরা।

Featured Photo Credit: dawn.com