২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে শিরোপা জেতার সুযোগ হারায় ইংল্যান্ড। শিরোপা জেতানোর সে গুরু দায়িত্বটা পড়েছিল স্টোকসের কাঁধে। কারণ, ম্যাচের শেষ ওভারটা যে তাকেই করতে হয়েছে।

শেষ ওভারে উইন্ডিজদের প্রয়োজন ছিল ১৯ রান। অনেকেই ধরেই নিয়েছিলেন ম্যাচটা ইংলিশরাই জিতবে। কিন্তু তা হতে দেননি কার্লোস ব্রাথওয়েট। প্রথম চার বলে চারটি ওভার বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দলকে জয় উপহার দেন তিনি। তখনই ভিলেন বনে যান স্টোকস।

Image Source: espncricinfo

তারপর ২০১৭ সালে একটি বারে হাতাহাতির ঘটনায় ওই বছর অ্যাশেজ সিরিজ থেকে বাদ পড়েন তিনি। খারাপ সময় কাটিয়ে উঠে এখন রীতিমতো তিনি ভিলেন থেকে নায়ক বনে গেছেন। তার হাত ধরেই ২০১৯ বিশ্বকাপ জয় লাভ করে ইংল্যান্ড, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত অ্যাশেজে তার দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে হারতে বসা ম্যাচে জয়ের দেখা পায় ইংলিশরা। একের পর এক চমক দিয়েই যাচ্ছেন তিনি।

চলুন জেনে নেওয়া যাক তার ক্যারিয়ারের সেরা ৫টি ইনিংস সম্পর্কে।

৫. অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১২০ রান; পার্থ

ডিসেম্বর; ২০১৩

২০১৩/১৪ মৌসুমের অ্যাশেজের আয়োজক দেশ ছিল অস্ট্রেলিয়া। হোম কন্ডিশনকে কাজে লাগিয়ে ৫-০তে সিরিজ জয় লাভ করে স্বাগতিকেরা। সে আসরটি ছিল কেভিন পিটারসনের শেষ আসর আর বেন স্টোকসের টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সিরিজ। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে তার অভিষেক হয়। কিন্তু নিজেকে সে ম্যাচে ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেননি বাম হাতি এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান।

Image Source: espncricinfo

তৃতীয় টেস্টে সুযোগ পেয়ে নিজেকে মেলে ধরেন তিনি। প্রথম ইনিংসে করেন ১৮ রান। শেষ ইনিংসে তার দলের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৫০৪ রান। টপ অর্ডারদের ব্যর্থতায় ম্যাচ জয় কিংবা ড্র‍য়ের দায়িত্ব এসে পড়ে মিডল অর্ডারদের কাঁধে। সে সময়ে দলের রানের চাকা সচল রাখতে ব্যাট হাতে সাহায্য করেন বেন স্টোকস। সদ্য ক্যারিয়ার শুরু করা স্টোকস পূর্ণ করেন তার অভিষেক সেঞ্চুরি।

Image Source: espncricinfo

এই সেঞ্চুরি দলকে জয় কিংবা ড্রয়ের স্বাদ দিতে না পারলেও হারের ব্যবধান কমিয়ে আনতে ভূমিকা পালন করে। ১৯৫ বলে ১২০ রানের ইনিংস খেলে লিয়নের বলে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন তিনি। ম্যাচটিতে তার দল ১৫০ রানের ব্যবধানে পরাজিত হয়। এই আসরে স্টোকসই ইংল্যান্ডের হয়ে একমাত্র সেঞ্চুরিয়ান ছিলেন।

৪. নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১০১ রান; লর্ডস

মে; ২০১৫

সিরিজের প্রথম টেস্টে প্রথম ইনিংসে শতক পূর্ণের ৮ রান দূরে থেকে আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়েন স্টোকস। ৯৪ বলে ৯১ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। সে ইনিংসে ৩৮৯ রানে পুঁজি পায় তার দল। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করে ৫২৩ রানের পুঁজি পায় নিউজিল্যান্ড। ১৩৪ রান পিছিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে ইংলিশরা। সে ইনিংসে শতক পূর্ণ করেই মাঠ ছাড়েন স্টোকস।

Image Source: espncricinfo

শুধু শতকই নয়, রেকর্ড করে মাঠ ছাড়েন তিনি। করেন লর্ডের টেস্ট ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরি। মাত্র ৮৫ বল খেলে শতক পূর্ণ করেন তিনি। যাতে ছিল ১৫টি বাউন্ডারি ও ৩টি ওভার বাউন্ডারি। ৯২ বলে ১০১ রানে থামে তার ইনিংস। শুধু ব্যাট হাতেই ওই টেস্টে দমে যাননি তিনি। বল হাতে শেষ ইনিংসে কিউই দুই তারকা ব্যাটসম্যান ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও কেন উইলিয়ামসনসহ মোট তিনটি উইকেট শিকার করেন তিনি।

ম্যাচটি ইংলিশরা ১২৪ রানে জয় লাভ করে। স্টোকস ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার লাভ করেন।

৩. দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২৫৮ রান; কেপ টাউন

জানুয়ারি; ২০১৬

২০১৬ সালে ইংল্যান্ড দল দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যায়। ৪ ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট স্বাগতিকদের হারিয়ে সফরের শুভ সূচনা করে ইংলিশরা। দ্বিতীয় ম্যাচে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় ইংল্যান্ড। ব্যাটিংয়ে নেমে দুর্দান্ত শুরু করলেও প্রথম দিনের দ্বিতীয় সেশন শেষ হওয়ার আগেই প্রোটিয়া বোলার রাবাদা ও মরকেলের বোলিং তোপে ১৬৭ রানে ৪ উইকেট হারায় ইংলিশরা।

Image Source: espncricinfo

পঞ্চম উইকেট জুটিতে মাঠে থাকা জনি বেয়ারস্টের সাথে যোগ দেন বেন স্টোকস। দুজনে মিলে ব্যাট করেন প্রায় ৫৮ ওভার। স্কোর বোর্ডে যোগ করেন ৩৯৯ রান। যা ইংলিশদের বড় সংগ্রহ এনে দেয়। বেয়ারস্টের সাথে জুটিতে ক্যারিয়ারের প্রথম দ্বিশতকের দেখা পান বেন স্টোকস। এতেও তিনি দমে যাননি, পূর্ণ করেন আড়াইশ রান।

স্টোকস ১৯৮ বলে ২৫৮ রান করে রান আউট হয়ে যান। তিনি মোট ৩০টি বাউন্ডারি ও ১১টি ওভার বাউন্ডারি হাঁকান। ৫ অর্ধশতকে এই ইনিংসটি স্টোকসের ক্যারিয়ারের অন্যতম একটি সেরা ইনিংস।

২. নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৪ রানে অপরাজিত; লর্ডস

জুলাই; ২০১৯

২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল, যা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক ম্যাচ। যেখানে কোনো দল অন্য দলকে পরাজিত করতে পারেনি। মূল খেলার পর সুপার ওভারেও ম্যাচটি ড্র থাকে। ফলাফল নির্ণয় করা হয় বাউন্ডারি হিসেব করে। জয়ী ঘোষণা করা হয় ইংল্যান্ডকে। ফাইনালে ইংল্যান্ড পুরো দলে সবচেয়ে ভালো খেলেছেন স্টোকস। কেননা, জয়ের নায়ক যে তিনিই ছিলেন।

Image Source: espncricinfo

মূল খেলা কিংবা সুপার ওভার সব জায়গায়ই ছিল স্টোকসময়। ২৪২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা ইংল্যান্ড দল ২৩ ওভারে ৮৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে। পঞ্চম উইকেট জুটিতে জস বাটলার ও স্টোকসের শত রানের জুটিতে জয়ের আশা দেখে ইংলিশরা। কিন্তু শেষ মূহুর্তে বাটলার আউট হয়ে গেলে চাপে পড়ে ইংল্যান্ড। তারপর একে একে ওকস, প্লাঙ্কেট, আর্চারের উইকেট হারায় তারা।

Image Source: espncricinfo

শেষ ওভারে তাদের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫ রানের। প্রথম দুই বলে রান নিতে পারলেও পরের দুই বলে দুইটি ওভার বাউন্ডারি হাঁকান স্টোকস। পরের বলে দুই রান নিতে গিয়ে রান আউটের শিকার হন রাশিদ। শেষ বলে ২ রান প্রয়োজন ছিল ইংল্যান্ডের, স্ট্রাইকে ছিলেন স্টোকস। এক রান নিতে পারলেও পরে রান আউট হয়ে যান উড। ম্যাচ ড্র অবস্থায় শেষ হয়। ৯৮ বলে ৫ চার ও ২ ছয়ে ৮৪ রানে অপরাজিত থাকেন স্টোকস।

১. অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৩৫ রানে অপরাজিত; হেডিংলি

আগস্ট; ২০১৯

২০১৯ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরপরই নিজ দেশে অ্যাশেজ খেলতে প্রস্তুত হয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ যেখানে শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকে শুরু করতে চাইলেও পরিকল্পনা মতো জয় তুলে নিতে ব্যর্থ হয় ইংলিশরা। সিরিজের প্রথম ম্যাচ ২৫১ রানে হার এবং দ্বিতীয় টেস্টে ড্র করে তারা। ১-০তে পিছিয়ে থাকা ইংলিশরা সিরিজ সমতায় আনে তৃতীয় ম্যাচে। সেখানেও জয়ের নায়ক বনে যান বেন স্টোকস।

Image Source: icc

তার ব্যাটিং শৈলীতে হারতে যাওয়া ম্যাচ জিতে নেয় ইংল্যান্ড। তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৭ রানে অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। ফলে ১১২ রানে এগিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে আরও ২৪৬ রান স্কোর বোর্ডে যোগ করে ৩৫৮ রানের টার্গেট দেয় অজিরা।

জবাবে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে ইংলিশরা। ব্যাটসম্যানদের আসা যাওয়ার মাঝে এক প্রান্ত আগলে খেলতে থাকেন স্টোকস।

Image Source: icc

শেষ উইকেট জুটিতে তার সাথে যোগ দেন জ্যাক লেচ। প্রয়োজন ছিল ৭৩ রানের। ম্যাচটি অজিরাই জিতবে বলে ধরেই নিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু সে ধারণা পাল্টে যায় জ্যাক লেচ আর স্টোকসের অসাধারণ পার্টনারশিপে। ৭৩ রানের মধ্যে ১ রান করেন লিচ আর বাকি রান আসে স্টোকসের ব্যাট থেকে।

এরই মধ্যে ক্যারিয়ারের ৮ম শতক পূর্ণ করেন স্টোকস। ম্যাচ শেষে ২১৯ বলে ১৩৫ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ম্যাচটি এই শতকের অন্যতম একটি স্মরণীয় টেস্ট ম্যাচ ছিল।

Featured Image: icc