গত মাসের শেষের দিকে ভারতের নারী ক্রিকেটার মিতালি রাজ ও তার কোচ রমেশ পাওয়ারের মধ্যকার বিতর্ককে ঘিরে টালমাটাল হয়ে উঠে ভারতের ক্রীড়াঙ্গন। এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে একের পর এক পোস্টে ভরে যায় ভারতের টুইটার ব্যবহারকারীদের টাইমলাইন। বিষয়টি নজর এড়ায়নি অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কেরও। তিনি মিতালিকে তার অভিযোগগুলো কোচ রমেশ পাওয়ার, বিসিসিআইয়ে ক্রিকেট  প্রশাসনিক কমিটির সদস্য দিয়ানা এডুলজি ও দলের নির্বাচকদের কাছে লিখিতভাবে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন।

মিতালি রাজ; Source: bbc.com

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৪ নভেম্বর। সেদিন মিতালির চোট থাকার কারণে তাকে ছাড়াই আইসিসি টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের  গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে নামে ভারত নারী দল, সেই ম্যাচে জয়ও পায় তারা।

পরের ম্যাচটি ছিল সেমিফাইনাল এবং  প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। সে ম্যাচের আগে ভারতের সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় মিতালি চোট থেকে সুস্থ হলেও তাকে বাদ রেখেই আগের ম্যাচের একাদশে থাকা খেলোয়াড়দের খেলান কোচ রমেশ পাওয়ার। কিন্তু  ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার কারণে ম্যাচটি ৮ উইকেটে হেরে যায় ভারতীয় নারী দল।

রমেশ পাওয়ার ও মিতালি রাজ; Source: deccanchronicle.com

মিতালিকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি অনেকেই ভালোভাবে নেননি। তবে প্রথমে বিষ্ফোরক মন্তব্য করেন তার ম্যানেজার। মিতালিকে রাজনীতি করে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর জল অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে, এমনকি কোচের পদ থেকে রমেশ পাওয়ারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই যে রমেশ ও মিতালির দ্বন্দ্ব, এর পেছনের কারণ কী?

ভারতের নারী ক্রিকেট দলের কোচ ও তারকা খেলোয়াড়কে ঘিরে যে বিতর্ক, সেখানে কলকাঠি নেড়েছেন অনেকেই। এমনকি দলের অনেক খেলোয়াড়ও মিতালির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, বিশেষ করে হরমনপ্রিত কাউর। বর্তমানে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের সবচেয়ে বড় দুই তারকা হচ্ছেন হরমনপ্রিত ও মিতালি। কিন্তু তাদের দুই জনের মধ্যে যে একটা ঠাণ্ডা লড়াই চলছিল, সেটা এই বিতর্কের পর অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে।

মিতালিকে ছাড়া যখন সেমিফাইনালে ভারত হেরে যায়, তখন তাকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে হরমনপ্রিতের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি উত্তর দেন,

যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, সেটা দলের ভালোর জন্যই করা হয়েছে।

হরমনপ্রিতসহ বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের কাছে রমেশের কোচিং যতটা পছন্দনীয়, মিতালির কাছে তেমনটা নয়। ফলে কোচের কাছে হরমনপ্রিত যতটা প্রিয়, মিতালি ততটা নন। এ কারণেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কপাল পোড়ে মিতালির। তবে ভারতের জাতীয় দলের সাবেক এই ক্রিকেটারকে নারী দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে দল হিসেবে ভারত বেশ উন্নতি করেছে।

 এই বিতর্কটি যে এতটা শোরগোল তুলবে, সেটা হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেননি। কিন্তু মিতালি ইস্যুতে বোর্ড যখন রমেশকে কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেবে বলে গুঞ্জন উঠে, তখন দলের টি টোয়েন্টি অধিনায়ক হরমনপ্রিত তাকেই কোচ হিসেবে চেয়ে বোর্ডে চিঠি পাঠিয়েছেন।

হরমনপ্রিত কাউর; Source: highlightsindia.com

এতে করে মিতালি ও হরমনপ্রিতের লড়াইয়ের বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে উঠে। তবে শুধুমাত্র হরমনপ্রিত নন, তার সাথে জোট বেঁধেছেন আরো কয়েকজন নারী ক্রিকেটার। এছাড়া মুম্বাই থেকে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি নাকি ম্যাচের আগে কোচ রমেশ পাওয়ারের কাছে  ফোন করেছিলেন আর সেই ফোনের পরই মিতালিকে বাদ দেওয়া হয়। কে সেই প্রভাবশালী, সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে সঠিক তথ্য না থাকলেও ফোন দেওয়ার বিষয়টি সত্যি বলেই জানতে পেরেছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড । যিনি ফোন করেছিলেন, তিনিও ক্রিকেটের সাথেই জড়িত বলে জানা গেছে।

তবে আজ মিতালিকে ঘিরে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তেমন বিতর্কের মুখে একদিন কপিল দেব বা শচীন টেন্ডুলকারকেও পড়তে হয়েছে। কপিল দেবকে অবসর নিতে হয়েছিল সেই সময়ের তরুণ পেসারদের বিরোধিতার মুখে পড়ে। আবার শচীনের শেষ এক বছরও কেটেছে অনেক তিক্ততার মধ্যে দিয়ে।

তেমনি আজ মিতালিকেও কথা শুনতে হচ্ছে। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই খেলোয়াড় দীর্ঘদিন ধরে দলের সাথে আছেন। কিন্তু এখন অনেকেই তাকে চান না। যারা তাকে চান না, তারা কৌশলে মিতালিকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। তবে ভারতের বর্তমান ওডিআই দলের অধিনায়ক মিতালি এখনো ফর্মে আছেন ।

রমেশ পাওয়ার; Source: telegraphindia.com

 এই বিতর্কের মাধ্যমে মিতালি ও পাওয়ার দুজনেই দলের ক্ষতি করেছেন। রমেশের পরিবর্তে ইতিমধ্যে অন্তবর্তী কোচ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মিতালি এখনো ওডিআই অধিনায়ক হিসেবে আছেন। এখন যিনি নতুন কোচ হিসেবে আসবেন, তিনি কাজ করার সময় যেমন বাড়তি চাপ অনুভব করবেন, তেমনি মিতালিকেও অনেক সমালোচনার জবাব দিয়ে দলে টিকে থাকতে হবে। কারণ হরমনপ্রিতসহ বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

মিতালি রাজ; Source: thenational.ae

এ ধরনের লড়াইয়ে দুই পক্ষই টিকে থাকতে পারে না, কাউকে না কাউকে সরে যেতে হয়। একসময় গ্রেগ চ্যাপেল ও সৌরভ গাঙ্গুলির দ্বন্দ্বের কারণে চ্যাপেলকে কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের ব্যর্থতার পর দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সরে যেতে হয় গাঙ্গুলিকেও। ভারতের নারী ক্রিকেট দলের এই বিতর্কে ইতোমধ্যে রমেশের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। এরপর হয়তো  মিতালিকেও সরে যেতে হবে।

রমেশ পাওয়ার ও মিতালি রাজ; Source: mynation.com

তবে এ ধরনের ঘটনার কারণে ব্যক্তির চেয়ে দলের ক্ষতি হয় বেশি। একদিকে দলের ভাবমূর্তি সঙ্কটে পড়ে যায়, অন্যদিকে দলের পারফরম্যান্সেও প্রভাব পড়ে। এছাড়া ভক্তরাও এই বিষয়গুলো সহজে মেনে নিতে পারেন না। তাই ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের উচিত হবে এখন থেকেই এমন প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। নয়তো তাদের নারী ক্রিকেটের উন্নতির পরিবর্তে অবনতিও ঘটতে পারে।

Featured Image: mynation.com