পার্থে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টে ভারতকে ১৪৬ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে সিরিজে সমতা এনেছে অস্ট্রেলিয়া। জয়ের জন্য দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের প্রয়োজন ছিল ২৮৭ রান। চতুর্থ দিন শেষে তাদের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ১১২ রান। ফলে পঞ্চম দিনে ভারতের দরকার ছিল ১৭৫ রান। কিন্তু শেষ দিনে মাত্র ২৮ রানেই শেষ পাঁচ উইকেট হারায় বিরাট কোহলির দল। ফলে ১৪৬ রানের বড় হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ভারতকে।

বিরাট কোহলি; Source: hindustantimes.com

পার্থ টেস্টের আগে গত ১০ মাসে ৭টি টেস্ট খেললেও জয়ের দেখা পায়নি অজিরা। এমনকি ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে চলমান সিরিজের প্রথম টেস্টেও হারের মুখ দেখেছে তারা। চলতি বছরের মার্চে  দক্ষিণ আফ্রিকায় বল টেম্পারিং কেলেংকারির পর এটিই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টেস্ট জয়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেই সর্বশেষ টেস্ট জিতেছিল অজিরা।

বল টেম্পারিং কাণ্ডের জন্য অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় স্টিভেন স্মিথকে। স্মিথের ডেপুটি ডেভিড ওয়ার্নারকেও একই শাস্তি প্রদান করা হয়। সেই ঘটনার পর অধিনায়কের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তরুণ ক্রিকেটার টিম পেইনের হাতে। অধিনায়ক হিসেবে পার্থেই প্রথম সাফল্যের দেখা পেলেন তিনি।

ম্যাচ শেষে দুই দলের অধিনায়কের করমর্দন ; Source: cricket.com.au

এছাড়া বল টেম্পারিংয়ের বিতর্কের পর অজিদের কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ান ড্যানের লেম্যান। পরবর্তীতে লেম্যানের জায়গায় কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় জাস্টিন ল্যাঙ্গারকে। পার্থের সন্তান ল্যাঙ্গারও পার্থে এসেই অস্ট্রেলিয়ার কোচ হিসেবে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেলেন।

চতুর্থ দিন ২৮৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারেই লোকেশ রাহুলকে হারায় ভারত। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই মিচেল স্টার্কের বলে বোল্ড হয়ে তিনি সাজঘরে ফেরেন। প্রথম উইকেট হারানোর ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই ভারতের দ্বিতীয় উইকেটের পতন ঘটে। অ্যাডিলেড টেস্টে ভারতের জয়ের নায়ক চেতেশ্বর পূজারা মাত্র ৪ রান করে হ্যাজেলউডের বলে উইকেটরক্ষক পেইনের হাত ক্যাচ দিয়ে মাঠ ছাড়েন। ভারতের সংগ্রহ তখন মাত্র ১৩ রান।

অজি খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস; Source: theguardian.com

শুরুতেই দুই উইকেট হারানোয় ব্যাকফুটে চলে যায় ভারত। এরপর দলের হাল ধরার জন্য উইকেটে আসেন দলের মূল ভরসা অধিনায়ক বিরাট কোহলি। মুরালি বিজয়ের সাথে ধীরে ধীরে জুটি গড়ার চেষ্টাও করেন তিনি। কিন্তু তাদের দুজনের জুটিকে খুব বেশি দূর এগোতে দেননি অজি অফ স্পিনার নাথান লায়ন। কোহলি ও বিজয় মিলে স্কোরবোর্ডে ২৫ রান যোগ করতেই কোহলিকে ফেরান লায়ন। ব্যক্তিগত ১৭ রানের মাথায় উসমান খাজার হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন ভারতীয় অধিনায়ক।

কোহলি আউট হওয়ার পর স্কোরবোর্ড ৭ রান যোগ হতেই বিদায় নেন ওপেনার মুরালি বিজয়। তাকেও ফেরান নাথান লায়ন।  মাত্র ৫৫ রানে ৪ উইকেট পড়ে যাওয়ায় হারের শঙ্কা দেখা দেয় সফরকারী শিবিরে। কিন্তু অজিঙ্কা রাহানে ও নবাগত হনুমা বিহারি ভারতকে সাহস যোগাতে থাকেন। তারা দুইজনে মিলে গড়েন ৪৩ রানের জুটি।

কিন্তু চতুর্থ দিনের শেষ মূহুর্তে এসে রাহানের উইকেট হারায় ভারত। ব্যক্তিগত ৩০ রানের মাথায় হ্যাজেলউডের বলে ট্রাভিস হেডের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান ভারতের অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান রাহানে। স্কোরবোর্ডে তখন ভারতের সংগ্রহ মাত্র ৯৮ রান।

নাথান লায়ন; Source: theguardian.com

১০০ রান পার হওয়ার আগেই পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ায় পার্থ টেস্টে ভারতের হার মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে এরপরও উইকেটে থাকা দুই তরুণ ব্যাটসম্যান হনুমা বিহারি ও ঋষভ পন্তের উপর ভরসা ছিল ভারতীয় দলের। দলীয় ১১২ রানে ভারত চতুর্থ দিন শেষ করে। হনুমা বিহারি ২৪ রানে অপরাজিত থাকেন।

পঞ্চম দিনে আর  চার রান করেই আউট হন হনুমা। মিচেল স্টার্কের বলে মিড উইকেটে মার্কাস হ্যারিসের হাতে ক্যাচ দিয়ে তিনি বিদায় নেন। তার উইকেট পতনের মধ্য দিয়ে ভারত ধীরে ধীরে হারের আরো সন্নিকটে যেতে থাকে।

মিচেল স্টার্ক উইকেট নেওয়ার পর তাকে ঘিরে ধরেন অজি ক্রিকেটাররা; Source: sportskeeda.com

হনুমা আউট হলে ঋষভ পন্ত কিছুটা মেরে খেলার চেষ্টা করেন। কিন্তু মেরে খেলতে গিয়ে তিনিও ব্যক্তিগত ৩০ রানে লায়নের বলে  পিটার হ্যান্ডসকম্বের হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হ্যান্ডসকম্ব অসাধারণ ক্যাচটি নেন। এর আগে প্রথম ইনিংসে স্লিপে দাঁড়িয়ে বিরাট কোহলির ক্যাচও নিয়েছিলেন হ্যান্ডসকম্ব, সেটিও ছিল দুর্দান্ত।

পন্ত আউট হওয়ার পর ভারতের দরকার ছিল ১৫০ রান। কিন্তু ভারতের লোয়ার অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যানরা উইকেটে দাঁড়াতেই পারেননি। মাত্র চার রান যোগ করতেই উমেশ যাদব, ইশান্ত শর্মা ও জাসপ্রীত বুমরা আউট হন। যাদব অবশ্য ২৩ বল পর্যন্ত লড়াই করে স্টার্কের বলে তার হাতেই ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন।

অজিদের উল্লাস; Source: cricket.com.au

এরপর ইশান্ত শর্মা উইকেটে এসেই মেরে খেলার চেষ্টা করেন। তার সে চেষ্টা পুরোপুরি বিফলে যায়। নামের পাশে কোনো রান যোগ না করেই প্যাট কামিন্সের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন ইশান্ত। একই ওভারে কামিন্সের হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন বুমরা। তিনিও রানের খাতা খুলতে পারেননি। ফলে ১৪০ রানে অলআউট হয়ে ১৪৬ রানের বিশাল হার নিয়ে মাঠ ছাড়ে কোহলি বাহিনী।

ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ ৩০ রান করেছেন অজিঙ্কা রাহানে ও ঋষভ পন্ত। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৩ উইকেট করে নিয়েছেন স্টার্ক ও লায়ন এবং দুইটি করে উইকেট নিয়েছেন কামিন্স ও হ্যাজেলউড। নাথান লায়ন দুই ইনিংস মিলিয়ে ৮ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হয়েছেন।

ম্যাচসেরা হয়েছেন নাথান লায়ন; Source: cricket.com.au

এর আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে করা ৩২৬ রানের জবাবে কোহলির সেঞ্চুরির উপর করে ২৮৩ রান তুলতে সক্ষম হয় ভারত। ফলে ৪৩ রানের লিড পায় অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ইনিংসে অজিরা ২৪৩ রানে অলআউট হলে ভারতের সামনে ২৮৭ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়। আগামী ২৬ ডিসেম্বর বক্সিং ডেতে মেলবোর্নে সিরিজের তৃতীয় টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে। সেই টেস্টে ভারত কেমন পারফরম্যান্স করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Featured Image: cricket.com.au