প্রত্যেক ক্রিকেটারকেই অনেক সংগ্রাম ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ভালো পারফরম্যান্স করে বিশ্ব ক্রিকেট প্রাঙ্গনে টিকে থাকতে হয়। তবে ক্রিকেট প্রাঙ্গন ছাড়াও কয়েকজন ক্রিকেটার বিভিন্নভাবে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে মৃত্যুকে জয় করে ক্রিকেট খেলেছেন। কেউ হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছেন, কেউবা ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর সেই অবস্থা থেকে ফিরে এসে আবারো ২২ গজের পিচ কাঁপিয়েছেন।

আজকের অনুচ্ছেদটিতে তেমনি পাঁচ ক্রিকেটার সম্পর্কে আলোচনা করব, যারা মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

৫. মাইকেল ক্লার্ক (অস্ট্রেলিয়া)

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা একজন ক্রিকেটার ছিলেন। অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে মিডল অর্ডারের অন্যতম ভরসার প্রতীক ছিলেন তিনি। এমনকি ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ক্লার্কের নেতৃত্বেই পঞ্চমবারের মতো শিরোপা অর্জন করে অস্ট্রেলিয়া।

মাইকেল ক্লার্ক; Image Source: Sporting News

তবে ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া মাইকেল ক্লার্ককে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রথম দিকেই বেশ বড় ধাক্কা সামলাতে হয়। ২০০৬ সালে ডাক্তাররা ক্লার্কের মুখমন্ডলে স্কিন ক্যান্সার শনাক্ত করেন। অল্পতেই ধরা পড়ার কারণে এবং তাৎক্ষণিক উপযুক্ত চিকিৎসার কারণে কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই ক্লার্ক পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং পুনরায় ক্রিকেটে ফিরে আসেন। যদিও তাকে চার মাসের মতো ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয়েছিল।

মাইকেল ক্লার্ক তার ১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সর্বমোট ৩৯৪টি ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে ১৭,১১২ রান করেন এবং বল হাতে ৯৪টি উইকেট শিকার করেন। মাইকেল ক্লার্ক স্লিপিং পজিশনেও বেশ ভালো একজন ফিল্ডার ছিলেন।

২. ম্যাথু ওয়েড (অস্ট্রেলিয়া)

অস্ট্রেলিয়া দলের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান ম্যাথু ওয়েড ক্রিকেট ক্যারিয়ারের আগে একজন ফুটবলার ছিলেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ান ফুটবল লীগে খেলতেন। তিনি যখন তরুণ অর্থাৎ ১৬ বছর বয়সে ওয়েড টেস্টিকুলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। মূলত একটি ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন তিনি কাঁধে আঘাত পেয়েছিলেন, যা পরে গুরুতর অবস্থা ধারণ করে। পরে তিনি একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হন এবং ডাক্তার তার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেন।

Image result for matthew wade

ম্যাথু ওয়েড; Image Source: Wide World of Sports – Nine

এরপর এই ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য তাকে দুইবার চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ম্যাথু ওয়েড স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। এবং ২০১১ সালে অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অভিষেক হয় তার। এখন পর্যন্ত ম্যাথু ওয়েড অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৪৫টি ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে ৩,০৫৩ রান করেন। বর্তমানে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাকে নিয়মিত খেলতে দেখা না গেলেও টেস্ট ক্রিকেটে দলের একজন নিয়মিত উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন ওয়েড।

৩. অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ (ইংল্যান্ড)

ইংল্যান্ড ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার ছিলেন অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ। বল ও ব্যাট হাতে দলের হয়ে মিডল অর্ডারের অন্যতম ভরসার প্রতীক ছিলেন তিনি। এমনকি ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা একজন অধিনায়কও অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ।

২০০৭ সালের বিশ্বকাপ চলাকালীন নিউজিল্যান্ডের সাথে একটি ম্যাচ হারার পর ইংল্যান্ডের সহ-অধিনায়ক অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ অতিরিক্ত মদ্যপান করেন। এই অবস্থায় তিনি বীচে বোট রাইড করতে গিয়েছিলেন। অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বীচের পানিতে ডুবে যান। ভাগ্যক্রমে তাৎক্ষণিক তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল। নতুবা তার সাথে বেশ বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত। মদ্যপানের অপরাধে পরবর্তীতে তাকে ইংল্যান্ড দলের সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়।

Image result for andrew flintoff

অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ; Image Source: The Cricket Monthly

১৯৯৮ সালে অভিষেক হওয়া অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ১১ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ২২৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। তিন ফরমেট মিলিয়ে বল হাতে সর্বোমোট ৪০০টি উইকেট এবং ব্যাট হাতে সংগ্রহ করেছেন ৭,৩১৫ রান।

২. জেসি রাইডার (নিউজিল্যান্ড)

নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে অন্যতম সেরা একজন মারমুখী উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ছিলেন জেসি রাইডার। তবে বিভিন্ন বির্তকিত ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কারণে বেশ ভালো পারফরম্যান্সে থাকার পরও কম সময়ের মধ্যেই ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ হয় তার। ২০০৯ সালে ক্রাইস্টচার্চের সাউথ ল্যান্ড সিটিতে একটি ক্লাবে হামলার শিকার হয়েছিলেন রাইডার। সে হামলায় মাথা ও ফুসফুসে বেশ গুরুতর আঘাত পেয়ে কোমায় চলে গিয়েছিলেন তিনি। বেশ কিছু দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে জীবন ফিরে পান জেসি রাইডার। হামলাকারী দুই ব্যক্তিকে পরবর্তীকে গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়া হয়।

Image Source: The Independent

সে ঘটনার পর সুস্থ হয়ে পুনরায় ক্রিকেটে ফিরতে তার ১ বছর সময় লেগেছিল। তবে আরো বেশ কিছু বির্তকিত ঘটনা ও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে জেসি রাইডার স্বেচ্ছায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার থেকে দূরে সরে আসেন। ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়ার পর ৬ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে নিউজিল্যান্ডের হয়ে ৮৮টি ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে ৩,০৮৮ রান করেন এবং বল হাতে ১৯টি উইকেট শিকার করেন রাইডার।

১. যুবরাজ সিং (ভারত)

ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং। ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যুবরাজের অনবদ্য পারফরম্যান্সেই প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল ভারত এবং ২০১১ সালের বিশ্বকাপেও যুবরাজ সিংয়ের অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সে ভারত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়।

বিশ্বকাপের পরের বছরই দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন যুবরাজ সিং। এরপর দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে কেমোথেরাপি দেওয়ার মাধ্যমে ক্যান্সারকে হারিয়ে দিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন যুবরাজ। অতএব প্রায় ১ বছর পর পুনরায় বীরত্বের সঙ্গে ক্রিকেট অঙ্গনে ফিরে আসেন তিনি।

যুবরাজ সিং; Image Source: entrepreneur.com

ভারতীয় ক্রিকেটের রাজপুত্র খ্যাত যুবরাজ সিংয়ের ১৮ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ভারতের হয়ে সর্বমোট ৪০২টি ম্যাচ খেলেন। ব্যাট হাতে করেন ১১,৭৭৮ রান এবং বল হাতে ১৪৮টি উইকেট শিকার করেন।

Featured Image Source: Asianet News Bangla