শুরুটা করা যাক আসিম কামালকে দিয়ে। পাকিস্তানি ক্রিকেটার আসিম কামালের কথা বলছি। অনেকেই হয়তো তাকে সময়ের ব্যবধানে ভুলে গেছেন।  গত দশকের মাঝামাঝিতে পাকিম্তানের হয়ে ১২টি টেস্ট খেলেছেন বামহাতি এই ব্যাটসম্যান। দেশের জার্সিতে অনেক দেরিতে তার অভিষেক হয়েছিল। ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানের হয়ে প্রথম টেস্ট খেলেন এবং কখনোই তিনি দেশের হয়ে রঙিন পোশাকে মাঠে নামতে পারেননি।

আসিম কামাল; Source: espncricinfo.com

পাকিস্তানের করাচি থেকে উঠে আসা এই আসিম ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র একজন ক্রিকেটার। তার কাভার ড্রাইভগুলোও ছিল মনোমুগ্ধকর।  ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে বড় কোনো সাফল্য না পেলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে তিনি অসাধারণ কিছু ইনিংস খেলেছেন।

আসিম তার অভিষেক টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে ৯৯ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন। এরপর রাওয়ালাপিন্ডিতে তিনি প্রায় ভাঙা হাত নিয়ে ভারতের বিপক্ষে অপরাজিত ৬০ রানের ইনিংস খেলেন। এক বছর পর তিনি মোহালিতে ভারতের বিপক্ষে খেলেন ৯১ রানের অনবদ্য এক ইনিংস , যার উপর ভর করে পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে সম্মানজনক স্কোর করতে সক্ষম হয়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি, শেন ওয়ার্ন ও স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলদের বোলিং আক্রমণ মোকাবেলা করে আসিম ১৫ চারসহ ৮৭ রানের এক ইনিংস খেলেন।

মোহাম্মদ হাফিজ; Image Source: sports.ndtv.com

আসিম কামাল তার ক্যারিয়ারে মাত্র ১২টি টেস্ট খেলে ৮টি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। মজার বিষয় হচ্ছে, তিনি চাপের মধ্যে অসাধারণ ব্যাট করতে পারতেন। কিন্তু যখন চাপ থাকতো না, তখন তিনি একেবারে ফ্লপ। ছিল। কিন্তু তার অসাধারণ ক্রিকেট প্রতিভাকে পাকিস্তানের কোচ বব উলমার সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেননি। এছাড়া অধিনায়ক ইনজামাম উল হকও তার প্রতি সদয় ছিলেন না, ফলে মাত্র ১২টি টেস্ট খেলার পরই আসিম কামালের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়।

ইনজামাম উল হক ; Source: thecricketmonthly.com

হাফিজ বিষয়ক লেখায় আসিম কামালের প্রসঙ্গটি হয়তো ধান ভানতে শিবের গীতের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু আসিমের বিষয়টি সামনে আনার কারণ হচ্ছে,  হাফিজের টেস্ট ক্যারিয়ারকে তুলনামূলকভাবে বিচার বিশ্লেষণ করা। আরব আমিরাতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হাফিজ তার ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলেছেন। অর্থাৎ তিনি টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। হাফিজের দীর্ঘ ১৫ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ার কেমন ছিল এবং তিনি কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছেন, সে বিষয়ে এবার আলোকপাত করা যাক।

মোহাম্মদ হাফিজ; Source: cricket.com.au

ক্রিকেটার হিসেবে আসিম কামাল ও মোহাম্মদ হাফিজ পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে। কারণ আসিম নিজেকে প্রমাণ করার জন্য খুব বেশি সুযোগ পাননি। কিন্তু হাফিজ তার ১৩ বছরের ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার সুযোগ পেয়েছেন। হাফিজ অনেক সুযোগ পেয়েও সেটাকে খুব বেশি কাজে লাগাতে পারেননি এবং টেস্টে নিজেকে ধারাবাহিকভাবে মেলে ধরতে পারেননি।

পাকিস্তান ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা হাফিজ, শোয়েব মালিক, ইমরান ফরহাত বা মোহাম্মদ সামির মতো ক্রিকেটারদের একের পর এক সুযোগ দিয়ে এসেছেন। কিন্তু আসিম কামাল, ফাওয়াদ আলম কিংবা মোহাম্মদ তালহার মতো ক্রিকেটারদের সুযোগ দেননি বললেই চলে। কিন্তু যে হাফিজদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে, তারা কতটা ভালো করেছেন?

ফাওয়াদ আলম; Source: cricket.com.au

মোহাম্মদ হাফিজ অভিষেকের পর পাকিস্তানের হয়ে  সাদা পোশাকে মোট তিনবার বিরতি দিয়ে দলে ঢুকেছেন। প্রতিবার এ বিরতি ছিল তিন বছর করে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে তার অভিষেক হয়। কিছুদিন টেস্ট খেলার পর তাকে দলের বাইরে পাঠানো হয়। এরপর তিনি ২০০৬ সালে  টেস্টে ফিরেই ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৫ রানের এক ইনিংস খেলেন। এরপর তিনি ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দলের বাইরে ছিলেন। এই সময়ে তিনি ঘরোয়া লিগে ফিরে যান, সেখানে কিছু রান করেন এবং আবারো দলে ফিরে আসেন।

হাফিজ ধারাবাহিক পারফরম্যান্স না করা সত্ত্বেও তাকে দলে কেন বার বার নেওয়া হয়েছে, সেটা একটা রহস্য। তবে হাফিজ যে সময়ে পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন, সেই সময়ে যারা নির্বাচক হিসেবে কাজ করেছেন, তারাও হাফিজের মতো একবার পদ হারিয়েছেন, আবার পদ ফিরে পেয়েছেন। ফলে তারা আগে যাদের পছন্দ করতেন, তাদেরকেই বারবার খেলিয়েছেন।

মোহাম্মদ হাফিজ; Source: sportskeeda.com

পাকিস্তান ক্রিকেটে নির্বাচকরা খুব বেশি ক্ষমতাবান নন। তাদেরকে দলের অধিনায়কের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। কামালকে ইনজামাম পছন্দ করতেন না, সে কারণে তিনি দলে বেশিদিন থাকতে পারেননি। আবার হাফিজকে মিসবাহ পছন্দ করতেন, সে কারণে তিনি বছরের পর বছর খেলেছেন এবং খারাপ করার পরও বারবার সুযোগ পেয়েছেন। মিসবাহ কখনো ফাওয়াদ আলমকে নিয়ে ভাবেননি, সে জন্য তিনি কখনো দলে বারবার সুযোগ পাননি।

হাফিজ তার ১৫ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে ৫২টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৩৯.১৮ গড়ে ৩৬০৫ রান করেছেন। এর মধ্যে  সেঞ্চুরি রয়েছে ১০টি এবং হাফ সেঞ্চুরি রয়েছে ১২টি। এছাড়া বল হাতে তিনি ৫৩টি উইকেট নিয়েছেন। অন্যদিকে, আসিম কামাল মাত্র দুই বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে ১২টি টেস্ট খেলে ৩৭.৭৩ গড়ে ৭১৭ রান করেছিলেন।

মোহাম্মদ হাফিজ; Source: express.co.uk

মোহাম্মদ হাফিজ নিজেকে মেলে ধরার যতটা সুযোগ পেয়েছেন অথবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তার যে দীর্ঘদিনের পদচারণা, সেটাকে তিনি কাজে লাগিয়ে পরিসংখ্যানকে আরো ভারী করতে পারতেন। এক বাক্যে হাফিজকে হয়তো পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যাবে না। তবে তার টেস্ট পরিসংখ্যান  তার দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ারের সাথে বেমানান।

হাফিজের মতো সুযোগ যদি আসিম কামাল বা ফাওয়াদ আলমকে দেওয়া হতো, সম্ভবত তারা আজ পাকিস্তানের প্রথম সারির ব্যাটসম্যানদের মধ্যে থাকতেন। পাকিস্তানের অধিনায়কেরা যেভাবে একজন ক্রিকেটারকে ব্যক্তিগত পছন্দের উপর ভিত্তি করে খেলার সুযোগ দেন, সেটা কখনোই উচিত নয়।

মিসবাহ উল হক; Source: www.khabarfeed.com

বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা তার সতীর্থদের প্রমাণের জন্য যথেষ্ট সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়ার পরও যখন কোনো খেলোয়াড় নিজেকে মেলে ধরতে পারেন না, তখন মাশরাফির কিছুই করার থাকে না। পাকিস্তানের অধিনায়কদের মাশরাফির এই নীতি মেনে চলা উচিত, তাহলে আসিম কামালদের মতো  ক্রিকেট প্রতিভারাও হারিয়ে যাবে না এবং হাফিজের মতো ক্রিকেটাররা পারফরম্যান্স না করেও দলে জায়গা ধরে রাখতে পারবে না।

Featured Image: cricket.com.au