পৃথিবীর ভূস্বর্গ হিসেবে পরিচিত কাশ্মির সৌন্দর্যের দিক থেকে অতুলনীয় হলেও সেখানে অধিকাংশ সময়ই অশান্তি বিরাজ করে। সেখানে একের পর এক সমস্যা লেগেই রয়েছে। কখনো পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষীদের গুলি, তো কখনো আবার ভারতীয় বাহিনীর অত্যাচার। বলতে গেলে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে থাকতে হয় কাশ্মির উপত্যকার মানুষদের।

রাশিখ দার; Source: twitter.com

তাই অপার সৌন্দর্যের মধ্যে থেকেও বেশ সংগ্রামের সাথেই বেড়ে উঠতে হয় কাশ্মিরিদের। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে কারো সংগ্রাম যদি তাকে পৌঁছে দেয় ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরে, তাহলে সেটি তার জন্য অনেক বড় এক পাওয়া। বলছি কাশ্মির থেকে উঠে আসা ক্রিকেটার রাশিখ সালাম দারের কথা।

রাশিখ দার; Source: wahcricket.com

ভারতের জন্মু ও কাশ্মির রাজ্যের কুলগাম জেলা থেকে উঠে এসেছেন ১৭ বছর বয়সী এই তরুণ। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের নিলামে তাকে ২০ লাখ রুপি দিয়ে কিনেছে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। জন্মু ও কাশ্মিরের তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনি আইপিএলে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। তার আগে কাশ্মিরের রাজ্য দলের অধিনায়ক পারভেজ রাসূল ও মনসুর দার আইপিএল খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন।

রাশিখের আইপিএল খেলার সুযোগ পাওয়ার খবরে শুধুমাত্র তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন নয়, বরং পুরো পাহাড়ি উপত্যকার মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কাশ্মিরের ক্রিকেটাঙ্গনের জন্য এটি অনেক বড় একটি আনন্দের সংবাদ। কারণ এই অঞ্চল থেকে ভারতীয় ক্রিকেটে খুব বেশি খেলোয়াড় প্রতিনিধিত্ব করতে পারেননি।

রাশিখ দার; Source: crictracker.com

ছেলে আইপিএলে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন, এমন সংবাদের পর রাশিখের মা সালিম দার বলেন,

আমরা সত্যিই অনেক খুশি। এটি পুরো কাশ্মিরের জন্য খুশির সংবাদ। তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, চাচা, চাচী, ভাইবোন সবাই অনেক খুশি। এটি সত্যিই সবার জন্য অত্যন্ত খুশির খবর। আমার ছেলে যে আজ এতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছে,  তার জন্য আমি অনেক বেশি গর্বিত।

ছোটবেলা থেকেই রাশিখের ক্রিকেটের প্রতি দুর্বলতা ছিল। তার ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হয়েছিল কুলগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানে টি টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট খেলার মধ্য দিয়ে। ১৭ বছরের এই তরুণ টানা ঘন্টায় ১৩৫ কিলোমিটার বেশি গতিতে বল করতে পারেন। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই পেসার হিসেবে তার নামডাক পুরো কাশ্মিরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তিনি রাজ্যের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অন্তর্ভুক্ত হন এবং গত অক্টোবরে কাশ্মিরের হয়ে বিজয় হাজারে ট্রফিতে খেলেন। এই টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র ২টি ম্যাচ খেলে ৩টি উইকেট নিয়েছেন।

রাশিখের বলে প্রচন্ড গতি থাকায় সতীর্থরা তাকে পাকিস্তানি পেসার হাসান আলির সাথে তুলনা করেন। তবে তার আদর্শ হচ্ছেন শোয়েব আখতার। তিনি শোয়েব আখতারের মতো প্রচণ্ড গতিতে বল করতে চান। তার ইচ্ছা, তিনি তার বলের গতি দিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখবেন।

কাশ্মিরের তরুণ এই ক্রিকেটারকে খুঁজে বের করেছেন ভারতের জাতীয় দলের সাবেক তারকা পেসার ইরফান পাঠান। চলতি বছর জন্মু ও কাশ্মির ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ইরফানকে রাজ্য দলের খেলোয়াড় হিসেবে খেলানোর পাশাপাশি তরুণ পেসারদের মেন্টর হিসেবে নিয়োগ দেন। তাকে সাথে নিয়ে স্থানীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন রাজ্যের সবগুলো জেলাতে প্রতিভা অন্বেষণে নেমে পড়ে। যখন তারা কুলগামে তরুণ ক্রিকেটারদের ট্রায়াল নিচ্ছিলেন, সেখানেই ইরফানকে মুগ্ধ করেন রাশিখ।

ইরফান পাঠানের সাথে রাশিখ দার; Source: twitter.com

সেখান থেকে রাশিখকে কাশ্মিরের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে জায়গা করে দেন ইরফান পাঠান। তিনি ১৭ বছরের এই তরুণ ক্রিকেটারকে নিয়ে তখনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, রাশিখ অনেক দূর পর্যন্ত যাবে। তার সেই কথা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

রাশিখের ক্রিকেটার হয়ে উঠার গল্প বলতে গিয়ে তার বড় ভাই ইরফান সালাম দার বলেন,

রাশিখ ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আসক্ত ছিল। একদম ছোট থাকতে সে ব্যাট আর বলের আবদার  করতো।  কখনোই বই অথবা অন্য কোনো কিছু কখনোই সে  চায়নি। যখন তার বয়স মাত্র আট বছর, তখন সে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ খেলে। সেই ম্যাচে  সে অনেক ভালো বল করেছিল এবং দুইটি উইকেটও পেয়েছিল। তখন থেকেই রাশিখ বেশ  ভালো গতিতে বল করতে পারত।

এ বছর ট্রায়ালে ইরফার পাঠান  প্রথমবারের মতো রাশিখকে দেখেন। তখন তিনি জানতে চান , সে কোথা থেকে এসেছে। আমার ভাই বলল, সে কুলগাম থেকে এসেছে। সেটা শুনে তিনি খুব খুশি হলেন। এরপর যখন তিনি রাশিখের বল করা দেখলেন, তখন তিনি আরো বেশি খুশি হলেন।  রাশিখকে  তিনি বললেন, তোমার এই প্রতিভা তোমাকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে।

 এরপর রাশিখ ভারতের এই সাবেক পেসারের সাথে একই ড্রেসিংরুমে সময় কাটিয়েছেন এবং তারা একসাথে খেলেছেন। সেই দিনগুলোর কথা মনে করে রাশিখ বলেন,

ইরফান পাঠানের মতো ক্রিকেটারের পাশে বসা, সেলফি নেওয়া অথবা অটোগ্রাফ নেওয়া প্রায় সবার কাছেই স্বপ্ন। আমি তার সাথে একই ড্রেসিং রুমে থেকেছি, একসাথে খেলেছি এবং কথা বলেছি। তিনি আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছেন।

ইরফানের নজরে পড়ে রাশিখ প্রথমে কাশ্মিরের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে জায়গা পান। এরপর তিনি কুচবিহার ট্রফিতে  এক ম্যাচে ছয় উইকেট নেন। তখন তিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের নজরে আসেন। এরপর তাকে ট্রায়াল দেওয়ার জন্য ডাকা হয়। তিনি যখন নেটে বোলিং প্র্যাকটিস করছিলেন, তখনই জানতে পারেন, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স তাকে নিলাম থেকে কিনেছে।

রাশিখ দার; Source: twitter.com

সেই মুহূর্তের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে রাশিখ বলেন,

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে আমি অনেক বেশি উত্তেজিত এবং সেই সাথে অনেক বেশি খুশি। রোহিত শর্মা ও যুবরাজ সিংয়ের সাথে খেলা অনেক বেশি সম্মানের। আমি লাসিথ মালিঙ্গার সাথে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি। আমি তার থেকে বোলিংয়ের বিষয়ে পরামর্শ নিতে চাই। আর আমাকে যদি সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমি আমার শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করব।

রাশিখকে ঘিরে কাশ্মিরের সাবেক ও বর্তমান সময়ের অনেক ক্রিকেটার, বিশেষ করে পারভেজ রাসূল বেশ উচ্ছ্বসিত। কারণ তিনি ছিলেন কাশ্মিরের প্রথম ক্রিকেটার, যিনি আইপিএল খেলার সুযোগ পেয়েছিল। সেই তালিকায় তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে রাশিখ অন্তুর্ভুক্ত হয়েছেন। তার সম্পর্কে পারভেজ বলেন,

তিনি আইপিএলে জায়গা করে নেওয়ায় আমি অনেক খুশি। তিনি এই পর্যন্ত আসতে অনেক পরিশ্রম করেছেন। আমি তার ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি কামনা করছি।

তবে রাশিখ আজ যতদূর পর্যন্ত এসেছেন, তার পেছনে বড় অবদান ছিল তার ভাই ইরফান সালাম দার, চাচাতো ভাই নাদিম আহমেদ ও কাশ্মিরের কোচ মিলাফ এমওয়ান্দের। তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি।  রাশিখ যদি তার প্রতিভার সদ্ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে তিনি হয়তো একদিন ভারতের পেস আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন।

Featured Image: crictracker.com