তিন ম্যাচের টি টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে উইন্ডিজকে ৩৬ রানে হারিয়ে সিরিজে সমতা ফেরাল বাংলাদেশ। টাইগারদের এই দুর্দান্ত জয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তিনিও করেছেন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। ব্যাট হাতে ২৬ বল মোকাবেলা করে খেলেছেন অপরাজিত ৪২ রানের এক অনবদ্য ইনিংস। এরপর বোলিংয়ে এসে ঘোল খাইয়ে দিয়েছেন ক্যারিবীয় পাঁচ ব্যাটসম্যানকে। ৪ ওভার বল করে মাত্র ২১ রানের খরচায় তুলে নেন পাঁচটি উইকেট। তাই ম্যাচ শেষে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটি সাকিবের হাতেই উঠেছে।

বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাট করে লিটন দাস, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহর ব্যাটিং নৈপুণ্যে নির্ধারিত ২০ ওভার ব্যাট করে চারটি উইকেট হারিয়ে ২১১ রান সংগ্রহ করে। এটি দেশের মাটিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টি-টোয়েন্টি স্কোর। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কোনো দলের সর্বোচ্চ টি টোয়েন্টি স্কোরও এই ২১১ রান। এর আগে যে রেকর্ডটি ছিল নিউজিল্যান্ডের দখলে।

Image source: cricketcountry.com

২১২ রানের বিশাল লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে ঝড়ো ব্যাটিং করলেও বাংলাদেশি বোলারদের তোপে নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকে উইন্ডিজ দল। শেষ পর্যন্ত ১৯.২ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ১৭৫ রান করতে সক্ষম হয় ক্যারিবিয়ানরা। ফলে বাংলাদেশ ৩৬ রানে জয়ী হয়ে সিরিজে সমতা ফেরায়।

একাদশ

বাংলাদেশ একাদশ

তামিম ইকবাল, লিটন দাস, সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক), সাকিব আল হাসান (অধিনায়ক), মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, মেহেদি হাসান মিরাজ, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, আরিফুল হক, আবু হায়দার রনি, মোস্তাফিজুর রহমান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ একাদশ

এভিন লুইস, শাই হোপ, শিমরন হেটমায়ার, ড্যারেন ব্রাভো, নিকোলাস পুরন, রভম্যান পাওয়েল, কার্লোস ব্র্যাথওয়েট (অধিনায়ক), ফ্যাবিয়ান এলেন, কেমো পল, শেলডন কোটরেল, ওশেন থমাস।

ম্যাচের বিবরণী

মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টসে জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে আমন্ত্রণ জানান ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক কার্লোস ব্রাথওয়েট। গত ম্যাচে প্রথম ব্যাট করে সবকটি উইকেট হারিয়ে ১২৯ রান করেছিল  বাংলাদেশ। সে কারণেই হয়তো কার্লোস ব্রাথওয়েট টসে জিতেও প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু ক্যারিবিয়ানরা এদিন দেখলো সম্পূর্ণ ভিন্ন বাংলাদেশকে। যে বাংলাদেশ সিরিজের প্রথম টি টোয়েন্টিতে স্কোর বোর্ডে ৩৮ রান জমা করতেই হারিয়েছিল চারটি উইকেট, আজ সেই বাংলাদেশ কোনো উইকেট না হারিয়ে প্রথম চার ওভারে করে ৪১ রান।

Image source: daily Bangladesh

তামিম ইকবাল আর লিটন দাসের ৪২ রানের ওপেনিং জুটির মাধ্যমে দুর্দান্ত শুরু করে বাংলাদেশ। তামিম ধীর গতিতে খেললেও শুরুতেই মারমুখী হয়ে উঠেন লিটন দাস। দলীয় ৪২ রানের মাথায় ফ্যাবিয়ান এলেনের বলে শেলডন কোটরেলের হাতে সহজ ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন ওপেনার তামিম ইকবাল। তিনি ১৬ বল মোকাবেলা করে ১৫ রান সংগ্রহ করেন।

এরপর দ্বিতীয় উইকেটে ওপেনার লিটন দাসের সঙ্গে জুটি বাঁধেন সৌম্য সরকার। সৌম্য ও লিটনের চমৎকার বোঝাপড়ায় ঝড়ের গতিতে রান জমা হতে থাকে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে। দ্বিতীয় উইকেটে এই দুই ব্যাটসম্যান চার ছক্কার ফুলঝুড়িতে গড়েন ৬৮ রানের জুটি। তবে দলীয় ১১১ রানের মাথায় বাংলাদেশের ইনিংসে আঘাত হানেন শেলডন কোটরেল। তার বলে  কট আউট হয়ে ব্যক্তিগত ৩২ রানের মাথায় সাজঘরে ফিরেন সৌম্য সরকার।

Image source: cricketcountry.com

সৌম্য ফিরে যাওয়ার পর বেশিক্ষণ উইকেটে টিকতে পারেননি লিটন দাসও। একই ওভারে শেলডন কোটরেলের বলে বোল্ড আউট হন লিটন দাস। সাজঘরে ফেরার  আগে তিনি ৩৪ বল মোকাবেলা করে ৬ চার ও চার ছক্কার ফুলঝুড়িতে খেলেন ৬০ রানের একটি দারুণ ইনিংস। বলতে গেলে লিটনের ইনিংসই বড় সংগ্রহের পথ দেখায় বাংলাদেশকে।

লিটনের আউটের পর ক্রিজে এসে সাকিবের সাথে জুটি বাঁধেন উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিম। কিন্তু মাত্র এক রান করেই ওশেন থমাসের বলে কট আউট হয়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন মুশফিক। ফলে ১০ রানের ব্যবধানে তিনটি উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ।

এরপর পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিজে এসেই তাণ্ডব শুরু করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। চতুর্থ উইকেটে সাকিব আল হাসান এবং মাহমুদউল্লাহ গড়েন অপরাজিত ৯১ রানের জুটি। মাহমুদউল্লাহ ২১ বল মোকাবেলা করে সংগ্রহ করেন ৪৩ রান। অপরদিকে সাকিব করেন ২৬ বলে ৪২ রান। ফলে ২০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ২১১ রানে। উইন্ডিজের পক্ষে ৪ ওভার বল করে ৩৮ রানের খরচায় সর্বোচ্চ দুটি উইকেট লাভ করেন শেলডন কোটরেল। এছাড়া থমাস ও এলিয়েন লাভ করেন একটি করে উইকেট।

শেই হোপ ; image source: bdcrictime.com

বাংলাদেশের দেওয়া ২১২ রানের পাহাড়সম রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ঝড়ো ব্যাটিং শুরু করেন ফর্মে থাকা শেই হোপ। তবে অন্য প্রান্তে থাকা এভিন লুইস ইনিংসের তৃতীয় ওভারে মাত্র এক রান করে সাজঘরে ফিরেন। তার উইকেটটি তুলে নেন আবু হায়দার রনি।

এরপর ক্রিজে এসে ওপেনার শেই হোপের সঙ্গে জুটি বাঁধেন নিকোলাস পুরান। পরবর্তী ২.১ ওভারে এই দুই ব্যাটসম্যান সংগ্রহ করেন ৪১ রান। তবে নিকোলাস আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেই তাকে ফেরান সাকিব আল হাসান। নিকোলাস পুরানের আউটের পর বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি শেই হোপও। ষষ্ঠ ওভারের মেহেদী মিরাজের বলে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন হোপ। ফলে উইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়ায় তিন উইকেটে ৬২ রান।

Image source: Dhaka Tribune

এরপর চতুর্থ উইকেটে শিমরন হেটমায়ার ও রভম্যান পাওয়েল প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তাদের জুটি থেকে উইন্ডিজের সংগ্রহে আসে ৩২ রান। কিন্তু দলীয় ৯৮ রানের মাথায় হেটমায়ার আউট হলে বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ে ক্যারবীয় ব্যাটিং লাইনআপ। পরবর্তীতে মিডল অর্ডারে রভম্যান পাওয়েলের ৫০ রান এবং লোয়ার অর্ডারে কেমো পলের ২৯ রান ছাড়া  উইন্ডিজের আর কোনো ব্যাটসম্যানই উল্লেখযোগ্য ইনিংস খেলতে পারেননি।

Image source: tigercricket.com.bd

১৯.২ ওভারে মাহমুদউল্লাহ বলে সর্বশেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ওশেন থমাস বোল্ড আউট হলে ৩৬ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। আর এই জয়ের মাধ্যমে তিন ম্যাচের টি টোয়েন্টি সিরিজে ১-১ ফিরিয়ে আনলো টাইগাররা। বাংলাদেশের পক্ষে সাকিব আল হাসান ৪ ওভার বল মাত্র ২১ রানের বিনিময়ে লাভ করেন ৫ টি উইকেট। এর মধ্য দিয়ে  টি টোয়েন্টিতে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে একই ম্যাচে ৪০ এর বেশি রান এবং পাঁচ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন সাকিব। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন,

আমরা ব্যাট হাতে দারুণ সূচনা করেছি এবং ২০ ওভার পর্যন্ত সেটা ধরে রেখেছি। এটা একটা দলীয় প্রচেষ্টা ছিল। লিটন কিছু অসাধারণ শট খেলেছে।  রিয়াদ যেভাবে শেষ করেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এরকম ভেজা কন্ডিশনে মিরাজ দারুণ বোলিং করেছে। দুর্দান্ত টিম এফোর্ট ছিল।

সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড

বাংলাদেশ ২১১/৪ (২০ ওভার)

লিটন ৬০, মাহমুদউল্লাহ ৪৩*, সাকিব ৪২*, সৌম্য ৩২

কটরেল ২/৩৮

 

উইন্ডিজ ১৭৫/১০ (১৯.২ ওভার)

পাওয়েল ৫০, হোপ ৩৬

সাকিব ৫/২১, মুস্তাফিজ ২/৫০

ম্যাচসেরা

সাকিব আল হাসান

Featured image source: the daily star