সেমিফাইনালের লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য ভারতের সাথে জয়ের বিকল্প ছিল না বাংলাদেশ দলের। তবে ম্যাচের আগে টুর্নামেন্টের পয়েন্ট টেবিলে শক্ত অবস্থানে থাকায় খানিকটা ফুরফুরে মেজাজেই খেলতে নামে টিম ইন্ডিয়া। ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে হেরে টুর্নামেন্টের গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নিতে হচ্ছে মাশরাফির বাংলাদেশকে।

আগে ব্যাট করতে নেমে রোহিত শর্মার সেঞ্চুরিতে ৯ উইকেটের বিনিময়ে ৩১৪ রানের পুঁজি পায় ভারত। বাংলাদেশী বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল মোস্তাফিজুর রহমান ৫৯ রানের বিনিময়ে নেন ৫ উইকেট। বড় পুঁজি তাড়া করতে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো বাংলাদেশ অলআউট হয় ২৮৬ রানে।

একাদশ

বাংলাদেশ

তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক), লিটন দাস, মোসাদ্দেক হোসেন, সাব্বির রহমান, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মাশরাফি বিন মর্তুজা (অধিনায়ক), রুবেল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান।

ভারত

লোকেশ রাহুল, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি (অধিনায়ক), ঋষভ পন্ত, হার্দিক পান্ডিয়া, মহেন্দ্র সিং ধোনি (উইকেটরক্ষক), দীনেশ কার্তিক, ভুবনেশ্বর কুমার, মোহাম্মদ শামি, জাসপ্রীত বুমরা ও যুজবেন্দ্র চাহাল।

ধারাবিবরণী:

বার্মিংহামের মন্থর উইকেটে টসে জিতে আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি। অধিনায়কের আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে, বাংলাদেশী বোলারদের উপর শুরু থেকেই চড়াও হন দুই ভারতীয় ওপেনার। দুই ওপেনারের ১৮০ রানের পার্টনারশিপই মূলত জয়ের শক্ত ভিত এনে দেয় ভারতকে। এবারের বিশ্বকাপে এখনো পর্যন্ত এটিই সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটির রেকর্ড।

রোহিতের সেঞ্চুরি; Source: BCB

প্রথম পাওয়ার প্লে থেকে কোনো উইকেট না হারিয়েই রোহিত, রাহুল জুটির উপর ভর করে স্কোরবোর্ডে ৬৯ রান তোলে ভারত। শুরু থেকেই রাহুলের থেকেও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশী বোলারদের তুলোধুনো করেন রোহিত শর্মা। অবশ্য মাত্র ৯ রানেই তামিম ইকবালের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরতে পারতেন রোহিত। ৯ রানে জীবন পাওয়া রোহিত আউট হয়েছেন নামের পাশে আরও ৯৫ রান যোগ করে।

রাহুল, রোহিত জুটি ভারতকে বড় সংগ্রহের দিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ভারতের দলীয় ১৮০ রানে রোহিত শর্মাকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে প্রথম উইকেট এনে দেন সৌম্য সরকার। আউট হওয়ার আগে ভারতীয় এই ওপেনার তার ১০৪ রানের ইনিংসটি সাজিয়েছেন ৭ চারের পাশাপাশি ৫ ছক্কায়।

রোহিত, কোহলি জুটি; Source: BCB

রোহিতের বিদায়ের পর আরেক ওপেনার লোকেশ রাহুলও বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেননি উইকেটে। ভারতীয় ইনিংসের ৩২.৪ ওভারে রাহুলকে ফেরান মেহেদি হাসান মিরাজের পরিবর্তে একাদশে আসা রুবেল হোসাইন। বিদায় নেয়ার আগে ৯২ বল খেলে স্কোরবোর্ডে ৭৭ রান তোলেন এই ভারতীয় ওপেনার।

দুই ওপেনারের ১৮০ রানের জুটির পর ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে আর তেমন কেউই বড় জুটি গড়ে তুলতে পারেননি৷ মুস্তাফিজুর রহমানের বল ঠিকমতো খেলতে না পেরে ২৭ বলে ২৬ করে বিদায় নেন ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলি। ভারতীয় অধিনায়কের বিদায়ের পর উইকেটে আসা হার্দিক পান্ডিয়াকে কোনো রান তুলতে না দিয়েই প্যাভিলিয়নে ফেরান মোস্তাফিজুর।

মোস্তাফিজুর রহমান; Source: BCB

১৮০ রানে প্রথম উইকেট হারানো ভারত নিজেদের চতুর্থ উইকেট হারায় ২৩৭ রানে। কোহলি এবং পান্ডিয়াকে দ্রুত আউট করে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান মোস্তাফিজুর। তবে ডেথ ওভারে অভিজ্ঞ ধোনিকে নিয়ে ঝড় তোলার আভাস দেন ঋষভ পন্ত। ৪১ বলে ৪৮ রান করা ঋষভকে বিদায় করে ডেথ ওভারে ভারতীয় ঝড় থামিয়ে দেন সাকিব আল হাসান।

ঋষভের বিদায়ের পর ধোনির উপর চাপ ছিল স্কোরবোর্ডে দ্রুত রান তোলার। তবে ভারতের সাবেক এই অধিনায়কের ৩৩ বলে ৩৫ রানের ইনিংসটি মেটাতে পারেনি ‘সময়ের দাবি’। ভারতীয় ইনিংসের শেষের দিকে মোস্তাফিজুর রহমানের অসাধারণ পারফরম্যান্সের জেরে কোহলির দলকে ৩১৪ রানেই আটকে ফেলে বাংলাদেশ। বাংলাদেশী বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল মোস্তাফিজুর ৫ উইকেট নিয়েছেন ৫৯ রানের বিনিময়ে।

ভারতের বেঁধে দেয়া ৩১৫ রানের লক্ষ্যে ম্যাচ জিততে শুরু থেকেই বড় পার্টনারশিপের দরকার ছিল বাংলাদেশের। সেমিফাইনাল খেলার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে দলের অন্যতম সেরা ব্যাটিং স্তম্ভ তামিমের থেকে দুর্দান্ত সূচনার প্রত্যাশা ছিল সমর্থকদের। পুরো টুর্নামেন্টে রানের জন্য ধুঁকতে থাকা তামিম এই ম্যাচেও পারেননি সমর্থকদের মন জয় করতে। ব্যক্তিগত ২২ রানে দেশসেরা এই ওপেনার যখন মোহাম্মদ শামির বলে বিদায় নেন তখন বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহ মাত্র ৩৯।

সাকিব আল হাসান; Source: Getty Image

তামিমের আউটের পর উইকেটে থিতু হয়েও পান্ডিয়ার বলে অহেতুক একটি বাজে শট খেলে কোহলির হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন সৌম্য সরকার। আউট হওয়ার আগে এই ওপেনারের ব্যাট থেকে আসে ৩৮ বলে ৩৩ রানের একটি ইনিংস। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে নিজের দ্যুতি ছড়ানো সাকিব আল হাসান এই ম্যাচেও ছিলেন উজ্জ্বল। প্রথমে সৌম্য সরকার এবং পরবর্তীতে মুশফিকুর রহিমের সাথে জুটি গড়ে বাংলাদেশের আশার আলো হয়ে ছিলেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার।

কিন্ত ২৩ বলে ২৪ রান করে মুশফিকুর রহিম বিদায় নিলে চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। ভালো শুরু করেও ২৪ বলে ২২ রান করে বিদায় নিয়ে বাংলাদেশের চাপ কমাতে পারেনি লিটন কুমার দাস। ১৬২ রানে লিটনের উইকেট হারানো বাংলাদেশ ১৭৯ রানে হারায় মোসাদ্দেক হোসাইন ও সাকিব আল হাসানের উইকেট৷ ৭৪ বলে ৬৬ রান করে সাকিব বিদায় নিলে বাংলাদেশের আশার প্রদীপ নিভে যায়।

মুশফিকুর রহিম; Source: BCB

তবে শেষের দিকে সাব্বির রহমান এবং সাইফউদ্দিনের সাহসী ব্যাটিংয়ে আবারও জয়ের স্বপ্ন বুনতে শুরু করে বাংলাদেশ। কোনো ব্যাটসম্যানই দীর্ঘসময় ধরে সঙ্গ দিতে না পারায় সাইফউদ্দিনের ৩৮ বলে ৫১ রানের লড়াকু ইনিংসটিও জয়ের মুখ দেখাতে পারেনি বাংলাদেশকে। ৪৮ ওভারে ২৮৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ, ম্যাচ হারে ২৮ রানের ব্যবধানে। অসাধারণ সেঞ্চুরির ইনিংস খেলার জন্য ম্যাচসেরার পুরষ্কার ওঠে রোহিত শর্মার হাতে।

Featured Photo Credit: Getty Image