একজন ক্রিকেটার কতটা মেধাবী হতে পারেন, সেটা তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার না দেখলে বোঝা যায় না। ক্রিকেটের শুরু থেকে আজ অবধি কত খেলোয়াড় এসেছেন, খেলেছেন, আবার অবসরেও চলে গেছেন। কিন্তু আমরা তাদের কয়জনার কথাই বা মনে রেখেছি ? তারপরও কিছু ক্রিকেটার আছেন, যারা তাদের ক্রীড়াশৈলীতে আমাদের মুগ্ধ করেছেন, ঠাঁই করে নিয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে। আর এই হাতেগোনা কয়েকজনের মধ্যে স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান ছিলেন অন্যতম। অস্ট্রেলিয়ার এই সাবেক ক্রিকেটারকে সর্বকালের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে গণ্য করা হয়।

অল্প বয়স থেকেই ক্রিকেট খেলার প্রতি পাগল ছিলেন তিনি। ক্রিকেটকে ছোট্ট শিশুর ন্যায় ভালোবাসতেন। যখন তার সাথে খেলার  কোন সঙ্গী পেতেন না, তখন একাকী নিজের সাথেই নিজে খেলতেন। তবে স্বভাবগতভাবেই তিনি প্রতিভাবান ছিলেন।  একজন খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য যে মানসিক মনোবল থাকা দরকার, তা তার মধ্যে ছিল।

স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান ; Source : www.ESPNcricinfo. com

নিঃসন্দেহে তিনি যেকোন খেলোয়াড়ের চেয়ে অধিক পারদর্শী ছিলেন। ক্রিকেটের প্রতি তার অসীম ভালোবাসার কারনেই তিনি এ পথ কে বেছে নিয়েছিলেন এবং ক্রিকেট কে করেছেন সমৃদ্ধ তার মহৎকর্মের মাধ্যমে। তিনি তার অবিচল একাগ্রতা ও ব্যাটের জোরালো আঘাতে স্থাপন করেছেন অনেক কীর্তি আর দলের জন্য বয়ে এনেছেন বহুসংখ্যক জয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারনে তিনি কিছু সময়ের জন্য ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন। কিন্তু ফিরে আসেন খুবই দ্রুত অস্ট্রেলিয়া দলে এবং নিজেকে মেলে ধরেন দুর্দান্তভাবে । তার অবসরের অনেক যুগ পরেও, ক্রিকেটের এই আধুনিক যুগে এখনো ক্রিকেটাররা তাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে তাকে অনুসরণ করে। আর আমাদের আজকের আয়োজন সাজানো হয়েছে ক্রিকেটের এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের জানা অজানা অনেক বিষয় নিয়ে।

শৈশবকাল

১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার নিউসাউথ ওয়েলসে, বাবা জর্জ ব্রাডম্যান ও মা এমেলি ব্রাডম্যানের ঘরে জন্মনেন স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্রাডম্যান। তিন বোন ও একভাইয়ের মধ্যে ডন ব্রাডম্যান ছিলেন কনিষ্টতম।

স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যানের শৈশব কাটানো প্রিয় বাড়ি ; Source : www.mid-day.com

ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা । স্বভাবসুলভ এই মেধাবী ক্রীড়াবিদ তার শৈশবে ক্রিকেট খেলেছেন, ব্যাটের বদলে স্ট্যাম্প ও ক্রিকেট বলের পরিবর্তে গলফ বল দিয়ে। তিনি ক্রিকেট খেলতে অভ্যস্ত হয়েছিলেন যখন তিনি বওরাল পাবলিক স্কুলে পড়তেন। সেখানেই তিনি জীবনের প্রথম শতক হাঁকিয়েছেন যখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর ছিলো।

তিনি ১৯২২ সালে স্কুল ত্যাগ করেন এবং স্থানীয় একটি রিয়েল এস্টেট এজেন্টে কাজ শুরু করেন। সৌভাগ্যক্রমে তার নিয়োগকর্তা বুঝতে পারলেন যে, ক্রিকেটের প্রতি ব্রাডম্যানের গভীর আসক্তি আছে আর সেইজন্য তাকে অনুমতি দিলেন যখন তার ইচ্ছা হবে  তখনই ক্রিকেট খেলতে যেতে পারবেন।

ক্যারিয়ার

মাত্র ১৯ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ওভালে প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে এই ক্রিকেটারের। সেই ম্যাচে অসাধারণ ব্যাটিং দক্ষতায় ১১৮ রানের চমৎকার ইনিংস খেলে তার প্রতিভার জ্বলন্ত প্রমাণ দেন তিনি।

 

 

 

 

১৯২৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের সাথে ডোনাল্ড ব্রাডম্যানের টেস্টে অভিষেক ঘটে। যদিও তিনি অভিষেক ও দ্বিতীয় টেস্টে আলো ছঁড়াতে পারেন নি। তবে ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টে তিনি পরিচয় দেন তার শক্তিমত্তার।

প্রথম ইনিংসে ৭৯ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ১১২ রান করে  সেই সময়ের সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে ইতিহাসের পাতায়  নাম লিখান এই অজি ব্যাটসম্যান।

ইংল্যান্ডের সাথে অ্যাশেজ সিরিজের কোন এক ম্যাচে ; Source : Fox Photos

তিনি ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডের সাথে ঐতিহাসিক অ্যাশেজ সিরিজ খেলার জন্য অস্ট্রেলিয়া দলে ডাক পান । সিরিজের প্রথম টেস্টে ১৩১ রান করেন। দ্বিতীয় টেস্টে ১টি শতকসহ ২৫২ রান করেন। স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান তার চমৎকার সেঞ্চুরির ধারাবাহিকতা তৃতীয় টেস্টেও অব্যাহত রাখেন।

যার দরুন তিনি তৃতীয় টেস্টের দু’টি ইনিংসেই আলাদাভাবে জোড়া শতক হাঁকান এবং সিরিজের চতুর্থ ও শেষ টেস্টে দু’টি শতকের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া কে এই অ্যাশেজ সিরিজ জেতাতে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা । ১৯৩০ সালে সমগ্র বিশ্ব যখন গুরুত্বর হতাশায় ঘুরপাক খাচ্ছে , ঠিক তখনি অস্ট্রেলিয়ার জন্য শান্তি এনেছিল তৎকালীন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের এই জয়। সেই সময়ে তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী বৃদ্ধি পায়।

১৯৩২-৩৩ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত অ্যাশেজ সিরিজকে ব্রাডম্যানের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের কঠিনতম সিরিজ হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়। দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বীর মর্যাদার এই লড়াইয়ে ডন ব্রাডম্যানের ব্যাটিং কৌশল কে, ইংল্যান্ডের দলপতি ডগলাস জারডাইন দৈহিক কৌশলের মাধ্যমে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নেন। আর কৌশলটি ছিল এমন, ব্যাটসম্যানের শরীর বরাবর লেগ স্ট্যাম্পের উপর বোলার বোলিং করে তাদের বল রাখবে।

ব্রাডম্যান কে রান হতে বঞ্চিত রাখতে তাদের এই কৌশলটি পুরোপুরিভাবে সফল হয়। আর সিরিজে তার ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ৫৬ । যার দরুন এই অ্যাশেজ সিরিজে জয় পায় ইংলিশরা । ১৯৩৮ সালে ইংল্যান্ড সফরে ব্রাডম্যান ফুটিয়ে তুলেন তার অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী।

এই সফরে তিনি ২৬ ইনিংস ব্যাট করে বিস্ময়কর ভাবে ১৩টি সেঞ্চুরি করতে সমর্থ হন। ১৯৪০ সালে তিনি রয়েল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সে যোগ দেন এবং বিমানের ক্রু হিসেবে উপযুক্ত বলে তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু পরে খুব শীঘ্রই তাঁকে সেনাবাহিনী তে স্থানান্তরিত করে লেফটেন্যান্ট পদে আসীন করা হয়।

ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলতে নামছেন ব্রাডম্যান ; Source : Instagram

তাকে সেনাবাহিনীর শারীরিক প্রশিক্ষনে পাঠানো হলে, শারীরিক প্রশিক্ষনের এই ধকল তার স্বাস্থ্যের উপর গুরুত্বর প্রভাব বিস্তার করে। স্বাস্থ্যের এই মারাত্বক অবনতির কারনে তাকে ১৯৪১ সালে চাকুরী থেকে বাদ দেওয়া হয়। তিনি আবারো ফিরে আসেন ক্রিকেটে চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি তে, ১৯৪৮ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের সাথে  ক্যারিয়ারের শেষ  টেস্টে ভাগ্যবিধাতার বিমুখতায় শূন্য রানে আউট হন ক্রিকেটের এই কিংবদন্তি। ফলে ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড় নিয়ে শেষ করতে হয় তার ক্রিকেট যাত্রা।

সাফল্য ও অর্জন

স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে মোট ৫২ টেস্টে ৮০ ইনিংস খেলে ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড়ে ৬৯৯৬ রান করতে সক্ষম হন। এছাড়াও তিনি ২৯টি সেঞ্চুরি করেন যেটা ছিল সেই সময়ের রেকর্ড পরিমান সেঞ্চুরি। এক টেস্ট সিরিজে ব্রাডম্যান সর্বোচ্চ ৯৭৪ রান করেন, তার এই রেকর্ড এখন পর্যন্ত কোন ব্যাটসম্যান ভাঙ্গতে পারে নি। ক্রিকেটে অসামান্য দায়িত্ব  পালন করার জন্য ১৯৪৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তাকে ‘ নাইট ব্যাচেলর ‘ উপাধিতে সম্মানিত করা হয় ।

১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডের সাথে সেরা রান সংগ্রাহক হিসেবে অর্জন করেন এই কাপ ; Source : www.crickethighlights.com

ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ১৯৭৯ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার কর্তৃক ‘কম্পানিয়ন অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া (AC) তে ভূষিত হন ডোনাল্ড ব্রাডম্যান। ২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার’ উইসডেন ক্রিকেট আলম্যানাক ‘ কর্তৃক বিংশ শতাব্দীর সেরা ক্রিকেটার হিসেবে ডন ব্রাডম্যান কে নির্বাচিত করা হয়। এই বিচারকার্য পরিচালনা করা হয় একশো জন বিচারকের মতে।

ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯২০ সালে জেসি মার্থার মেনজিসের সাথে তার দেখা হয়। অনেক বছর চুঁকিয়ে প্রেম করার পর ১৯৩২ সালে দুজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৬৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে ব্রাডম্যানের সুখ দুঃখে সবসময় ছাঁয়ার মতো পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী।

তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সন্তানদের সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। এক ছেলে মারা যায়, অপর শিশু পোলিওয় আক্রান্ত ছিলো। আর অপর কন্যা সন্তান মস্তিষ্কে সমস্যা নিয়ে জন্মায়।

১৯৯৭ সালে ডন ব্রাডম্যান কে ছেড়ে পরলোক গমন করেন তার স্ত্রী। পক্ষান্তরে ২০০১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বাইশগজ মাতানো সর্বকালের সেরা এই কিংবদন্তি ৯২ বছর বয়সে পৃথিবীর সবকিছু কে তুচ্ছ করে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।

Featured Image : Instagram