বর্তমান সময়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফরমেট হলো টি-টোয়েন্টি ফরমেট। আর যদি সেটা হয় বিশ্বকাপ আসরে, তাহলে তার জাঁকজমকতা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের সকল ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে। ২০১৯ সালের জাঁকজমকপূর্ণ ওয়ানডে ক্রিকেট বিশ্বকাপের পর ক্রিকেটপ্রেমীরা এবার অপেক্ষা করছে ২০২০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য। এটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সপ্তম আসর, যার আয়োজক এককভাবে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড।

২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার সাইমন্ডস স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয়ে দীর্ঘ ২৯ দিন শেষে সর্বমোট ৪৫টি ম্যাচের মধ্য দিয়ে ১৫ নভেম্বর মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের যাত্রা শেষ হবে। বিশ্বকাপের ৪৫টি ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার সাতটি বিখ্যাত ও নান্দনিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। আজকের আর্টিকেলে সেই সাতটি স্টেডিয়াম নিয়েই আলোচনা করব।

সাইমন্ডস স্টেডিয়াম, গিলং

অস্ট্রেলিয়ার গিলংয়ে অবস্থিত সাইমন্ডস স্টেডিয়ামটি ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও মাঠটি সাধারণত ফুটবল খেলার জন্য ব্যবহৃত হতো। তবে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এই স্টেডিয়ামে। টি-টোয়েন্টি ফরমেটে ম্যাচটিতে অংশগ্রহণ করেছিল অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কা। এবং এই ম্যাচটিই ছিল সাইমন্ডস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত একমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। 

সাইমন্ডস স্টেডিয়াম; Source: Leading Edge Automation

ম্যাচটিতে অস্ট্রেলিয়ার ১৭৩ রানের বিপরীতে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে শেষ বলে জয় ছিনিয়ে নেয় শ্রীলঙ্কা। সে ম্যাচে শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান দাশ গুনারত্নের ৮৪ রানের ইনিংসটি ছিল সর্বোচ্চ। এবং বল হাতে নুয়ান কুলাসেকারার ৩১ রানে ৪ উইকেটের বোলিং ফিগারটি ছিল সাইমন্ডস স্টেডিয়ামের সেরা বোলিং ফিগার।

৩৬ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই স্টেডিয়ামটিতে ২০২০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মোট ৬টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এমনকি ২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর এই মাঠেই উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হবে।

বেলেরিভ ওভাল, হোবার্ট

অস্ট্রেলিয়ার বেলেরিভ ওভাল স্টেডিয়ামটি তাসমানিয়া অঙ্গরাজ্যের হোবার্টে অবস্থিত। এই স্টেডিয়ামটি ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৮৮ সালে নিউজিল্যান্ড বনাম শ্রীলঙ্কার মধ্যবর্তী একদিনের ম্যাচের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এবং ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

বেলেরিভ ওভাল; Source: Wikipedia

স্টেডিয়ামটিতে এ পর্যন্ত ৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে প্রথমে ব্যাট করতে নামা দল দুটি ম্যাচ জয় লাভ করে এবং পরে ব্যাট করা দল একটি ম্যাচে জেতে। টি-টোয়েন্টিতে এই মাঠে দলীয় সর্বোচ্চ ২১৩ রানের ইনিংসটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার। এক ইনিংসে একজন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ অপরাজিত ১০৩ রানের ইনিংসটি ছিল গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের এবং এক ইনিংসে ৩১ রান দিয়ে ৪ উইকেটের সেরা বোলিং ফিগারটি ছিল আরেক অস্ট্রেলিয়ান বোলার কালটার নাইলের।

এই স্টেডিয়ামটিতেই ২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের ৬টি ম্যাচসহ সুপার ১২ পর্বের দুটি ম্যাচও অনুষ্ঠিত হবে। ম্যাচগুলো একই সাথে ২০ হাজার দর্শক গ্যালারিতে বসে উপভোগ করতে পারবে।

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড, সিডনি

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে অবস্থিত সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড স্টেডিয়ামটি স্থাপিত হয় ১৮৪৮ সালে। এই মাঠটিতে ১৮৮২ সালে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৮৯ সালে ওয়ানডে আন্তর্জাতিক এবং ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে।

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড; Source: Wikipedia

স্টেডিয়ামটিতে এ পর্যন্ত ৬টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে প্রথমে ব্যাট করতে নামা দল দুটি ম্যাচ এবং টার্গেট নিয়ে ব্যাট করতে নামা দল চারটি ম্যাচে জয় লাভ করে। এই মাঠে এক ইনিংসে দলীয় সর্বোচ্চ ২২১ রানের রেকর্ডটি স্বাগতিক দল অস্ট্রেলিয়ার। ব্যাটিংয়ে একজন ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১২৪ রানের অপরাজিত ইনিংসটি ছিল অস্ট্রেলিয়ান টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান শেন ওয়াটসনের। এবং বোলিংয়ে এই ভেন্যুতে এক ইনিংসে ২৩ রানে ৪ উইকেটের সেরা বোলিং ফিগারটি আরেক অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট মিডিয়াম বোলার অ্যান্ড্রু টাইয়ের।

২০২০ সালের সপ্তম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার এই বিখ্যাত স্টেডিয়ামটিতে সুপার ১২ পর্বের ৬টি ম্যাচসহ একটি সেমিফাইনাল ম্যাচও অনুষ্ঠিত হবে। ম্যাচগুলো ৪৮ হাজার ক্রিকেটপ্রেমী গ্যালারিতে বসে দেখতে পারবে।

পার্থ স্টেডিয়াম, পার্থ

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি। স্টেডিয়ামটি মূলত তৈরি হয়েছে ২০১৭ সালের শেষের দিকে এবং ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে এটি উদ্বোধন করা হয়। তার সপ্তাহ খানেক পরেই ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার একদিনের ম্যাচ দিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও এ স্টেডিয়ামটি অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলের জন্যও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়াম।

পার্থ স্টেডিয়াম; Source: Arup

অস্ট্রেলিয়ার নতুন এই স্টেডিয়ামটিতে একটি মাত্র টেস্ট ও ২টি ওয়ানডে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলেও কোনো টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার ১২ এ ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচটিই হবে পার্থ স্টেডিয়ামে প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। এছাড়াও এই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের সুপার ১২ এর আরো পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ম্যাচগুলো গ্যালারিতে বসে একই সাথে ৬০ হাজার দর্শক উপভোগ করতে পারবে।

ব্রিসবেন ক্রিকেট গ্রাউন্ড, ব্রিসবেন

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের রাজধানী ব্রিসবেনে অবস্থিত এই ব্রিসবেন ক্রিকেট গ্রাউন্ড স্টেডিয়ামটি সাধারণত ‘দি গাব্বা’ স্টেডিয়াম নামে অধিক পরিচিত। এটি ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩১ সালে স্টেডিয়ামটিতে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৭৯ সালে ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এই ব্রিসবেন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে।

বিসব্রেন ক্রিকেট গ্রাউন্ড; Source: Wide World of Sports – Nine

ব্রিসবেন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে এ পর্যন্ত চারটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। তার মধ্যে প্রথমে ব্যাট করতে নামা দল ৩টি ম্যাচ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা দল একটি ম্যাচ জেতে। এই মাঠে এক ইনিংসে দলীয় সর্বোচ্চ ২০৯ রান করেছিল স্বাগতিক দল অস্ট্রেলিয়া এবং এক ইনিংসে সর্বনিম্ন ১১৪ রানের ইনিংসটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। ব্যাটিংয়ে একজন ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৯৬ রানের ইনিংসটি ছিল অস্ট্রেলিয়ান টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান ড্যামিন মার্টিন এবং বোলিংয়ে এই ভেন্যুতে এক ইনিংসে ২৮ রানে ৩ উইকেটের সেরা বোলিং ফিগারটি ছিল আরেক অস্ট্রেলিয়ান বোলার জেমস ফল্কনারের।

২০২০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্রিসবেন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সুপার ১২ পর্বের চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ম্যাচগুলো ৪২ হাজা দর্শক মাঠে বসে উপভোগ করতে পারবে।

অ্যাডিলেড ওভাল, অ্যাডিলেড

অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত অ্যাডিলেড ওভাল স্টেডিয়ামটি অস্ট্রেলিয়ার নর্থ অ্যাডিলেডের পার্কল্যান্ডে অবস্থিত। এটি ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপরের বছরই অর্থাৎ ১৮৮৪ সালে অস্ট্রেলিয়া বনাম ইংল্যান্ডের টেস্ট ম্যাচের মধ্য দিয়ে এ স্টেডিয়ামটিতে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৭৫ সালে ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এবং ২০১১ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

অ্যাডিলেড ওভাল; Source: Arup

অ্যাডিলেড ওভাল স্টেডিয়ামে সর্বমোট ৪টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে দুইটি ম্যাচ প্রথমে ব্যাট করা দল ও দুইটি ম্যাচ দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা দল জয় লাভ করে। এই ভেন্যুতে এক ইনিংসে দলীয় সর্বোচ্চ ১৮৮ রানের ইংনিসটি ছিল ভারতের। ব্যাটিংয়ে একজন ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৯০ রানের অপরাজিত ইনিংসটি ছিল বিরাট কোহলির এবং এক ইনিংসে ১৫ রানে ৪ উইকেটের সেরা বোলিং ফিগারটি ছিল শেন ওয়াটসনের।

প্রায় ৫৪ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন অস্ট্রেলিয়ার এই অ্যাডিলেড ওভাল স্টেডিয়ামে ২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনাল ম্যাচসহ সুপার ১২ পর্বের আরো ৬টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। 

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড, মেলবোর্ন

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরের ইয়ারা পার্কে এই নান্দনিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি অবস্থিত। এটি ১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচটি ১৮৭৭ সালে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম একদিনের ম্যাচটিও ১৯৭১ সালে এই মেলবোর্ন স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হয়।

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড; Source: cricketcountry.com

অস্ট্রেলিয়ার এই বিখ্যাত মেলবোর্ন স্টেডিয়ামে এ পর্যন্ত ১২টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে ৬টি ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করা দল এবং ৫টি ম্যাচে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা দল জয় লাভ করে। একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এই মাঠে এক ইনিংসে দলীয় সর্বোচ্চ ১৮৪ রানের ইনিংসটি ছিল ভারতের। ব্যাটিংয়ে এক ইনিংসে একজন ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৮৯ রানের ইনিংসটি ছিল ডেভিড ওয়ার্নারের এবং বল হাতে ৩০ রানে ৪ উইকেটের সেরা বোলিং ফিগারটি ছিল জস হাজলেউডের।

অস্ট্রেলিয়ার এই মেলবোর্ন ক্রিকেট স্টেডিয়ামেই ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ২০২০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যাত্রা শেষ হবে। এছাড়াও এই ভেন্যুতে সুপার ১২ পর্বের আরো ৬টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। মেলবোর্নের এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামটিতে একসাথে ৯০ হাজার দর্শক বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো উপভোগ করতে পারবে।

Featured Image Source: Afghanistan Cricket Board